অপয়া

অপয়া

আমার যখন সম্পূর্ণ জ্ঞান হল, তখন দেখি আমি টানটান হয়ে শুয়ে রয়েছি বাবার তাঁত ঘরে। আনকোরা ফুলওয়ার নকশা আর সোনালী সুতোর জেল্লায় ঠিকরে পড়ছে আমার জৌলুস। আমার সোনার চাঁপা রঙের জমির দিকে একবার তাকালে যে তোমরা কেউ চোখ ফেরাতে পারবে না, তা আমি হলফ করে বলতে পারি। আমি দেখলাম, বাবা আমার গায়ের নকশায় সযত্নে হাত বুলিয়ে দিলেন। অস্ফুট স্বরে নিজের মনেই বললেন- “বাহ! কী চমত্কার দেখতে লাগছে!” বাবার সস্নেহ দৃষ্টি আমাকে খানিক আদুরী করে তুলল। বাবা শুনতে না পেলেও আমি খুশিতে গদগদ হয়ে বললাম, “চমত্কার দেখতে হবে নাই বা কেন? আমার পিছনে কি তোমার কম পরিশ্রম গেছে?”

তোমরা হয়তো জানো না, কিন্তু আমি জানি। আড়াই মাস আগে সেই যখন আমি সুতো হয়ে জন্মে এই ঘরে এলাম সেই দিন থেকে আমি বাবার হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমটা নিজের চোখে দেখেছি। বাবা সেই কোন কাকভোরে উঠে আমাকে গড়ার সুতো রঙ করার জন্য বনের ফল-ফুল-লতা-পাতা যোগাড় করে আনতেন। তারপর নিজের হাতে রঙ তৈরি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। বাবার সুতো রঙ করা হয়ে গেলে তাতে ভাত কিংবা বার্লির মাড় দিয়ে দিতেন আমার মা। অবশ্যি বাজারে এখন ভালো রঙ করা সুতো, আর সুতোর কৃত্রিম রঙ পাওয়া যায়। কিন্তু সে সবের অনেক দাম। আমার বাবার অত সামর্থ্য নেই। গরীব তাঁতির টানাটানির সংসার। বুঝতেই পারছ? না, তোমরা হয়ত বুঝতে পারবে না। কারণ অভাব কী জিনিস তা যার দুয়ারে এসে কড়া নাড়ে একমাত্র সেই বুঝতে পারে। বলিরেখাময় কপালে ভাঁজ নিয়ে পাওনাদারের দেনার অংক হিসেব করার সময় আমার বাবা বুঝতেন অভাব কী? মুসুরির ডালের খালি কৌটোর দিকে তাকিয়ে কিংবা গ্যাসের খরচ বাঁচাতে কাঠের জ্বালে ভাত রান্নার সময় আমার মা বুঝতে পারতেন অভাব কী। কয়েক বছর ধরেই বাবার শরীর বিশেষ ভালো নেই। অকাল বয়সের ভারে ন্যুব্জ, টানের রোগ শরীরে বাসা বেঁধে আছে বহুদিন। ফটোতে দেখেছি আমার বাবার এক ছেলে ছিল। সে যে অল্প বয়সে বাড়ি ছেড়ে কোথায় চলে গেছে, কেউ জানে না। মা বাবাও আর ওকে নিয়ে কথা বলে না। অসুস্থ শরীর নিয়েও হেমন্তের শিরশিরে কাকভোরে উঠে বাবা সুতো কাটতে শুরু করতেন। ভোরের হাওয়ায় জল ভাব বেশি থাকে, ঐ সময় ভালো সুতো কাটা যায়। বাবার পাশাপাশি বাঁশের ঝুড়ি, টাকু, শাঁখ, পাথরের বাটি আর গেঁটে বাতের ব্যাথা নিয়ে বসতেন আমার মা। সুতোর মাকু বাবার হাত থেকে মায়ের হাতে দেওয়ার সময় বাবার খুকখুকে কাশি শুনে আমি খুব কষ্ট পেতাম। তলানিতে পড়ে থাকা জীবনীশক্তিটুকু দিয়ে বাবা তাঁত বুনতেন। সুতোর টানাপোড়েনে ধীরে ধীরে তৈরি হতাম আমি। আমার স্বর্ণ চাঁপার মতো জমিতে ফুটে উঠত ফুলওয়ার নকশা।

তাঁতঘরে গল্প করতে আসা পাড়ার বয়স্ক দাদুদের বলতে শুনেছি, এখন আমাদের শান্তিপুর গ্রামে নাকি আমার বাবার মতো সনাতনী জামদানি নকশাকার আর দুটি নেই। এখনকার তাঁত কারিগরদের মতো বাবা কাগজে নকশা আঁকেন না। আমার বাবা নকশা তোলেন আমার ঠাকুর দাদার কাছে শেখা তাঁত বোনার স্মৃতি থেকে। বাবাদের সাত পুরুষের তাঁত বোনার ব্যবসা। বাবাকে বলতে শুনেছি, আমার বড় ঠাকুরদার হাতের তৈরি পান্না হাজার, চারকোণা, ময়ূর প্যাঁচ, কলমি লতা, পুঁই লতা, কচু পাতা, কাটিহার, কলকা পাড়, শামুক বুটি, প্রজাপতি বুটি, বেল পাতা পাড়, দুবলি জাল, বুটিদার, ডুরিয়া, আঙুরলতা, কলস ফুল, সন্দেশ পাড়, প্রজাপতি পাড়, দুর্বা পাড়, চন্দ্র পাড়, চন্দ্রহার, হংস, ঝুমকা, চালতা পাড়, ইঞ্চি পাড় আর বিলাই আড়াকুল নকশার জামদানি নাকি লোকে মুগ্ধ চোখে চেয়ে দেখত। দুগ্গা পুজো, কালীপুজোর সময় জমিদার আর অভিজাত বাবুদের বাড়ি থেকে দাদন দিয়ে তাঁত বুনতে নিয়ে যেত বাবুদের কারখানায়। দিন রাত তাঁত চালিয়ে সে সব শাড়ি তৈরি করতেন আমার ঠাকুরদা আর তাঁর বাবা। পুজোর বকশিশ নিয়ে হাসি মুখে বাড়ি ফিরতেন দুজনে। নবাবী আমলে আমার ঠাকুরদার ঠাকুরদা নাকি আবার বেগমদের জন্য সোনা রুপার জরিতে বোনা বেলওয়ারি জামদানিও তৈরি করতেন। নবাবের হারেমের মেয়েদের জন্য তৈরি করা ডুরিয়া জামদানির সংখ্যাও নেহাত কম ছিল না। ওদের সময়ে নাকি বণিক কোম্পানীর মারফত দেশের বাইরে থেকে সাহেবদের অর্ডার আসত। উনিশ শতকের প্রথম দিকে যবে থেকে অল্প দামের মিলের কাপড় বাজারে ছেয়ে গেল, তবে থেকেই জামদানির রমরমা কমতে শুরু করে। আমার ঠাকুরদাদার সময়ে তবুও কিছু সেকেলে মানুষ ভালো জামদানির কদর করত। কলকাতার বনেদী বাড়ির অর্ডারি শাড়ি গাঁটরিতে বেঁধে দিয়ে আসতেন আমার বাবা। বাবাদের সাত পুরুষের সেই ঐতিহ্যময় তাঁত বুনন ব্যবসা এখন মুখ থুবড়ে পড়েছে, মেরুদণ্ড বাঁকিয়ে আমার বাবার মতই ধুঁকছে। বাবা মাঝে মাঝে দুঃখ করে বলেন, আমাদের পেটের জ্বালাটা কেউ বোঝে না। না সরকার, না ব্যাবসাদার, না দোকানদার। তাছাড়া এখন আগের মতো শাড়ির পরার চলই বা কোথায় ? আর ভালো জামদানি নকশার কদর করার লোকই বা কোথায়? ব্যাবসাদার চৌকাঠ পেরোতে না পেরোতেই “কত কম মজুরিতে বুনে দেবে?” আর “কত তাড়াতাড়ি মাল্ দেবে?” এই দুটো প্রশ্ন করে। ওদের কাছে তেরছা জামদানি যা, ফুলওয়ার জামদানিও তা। ওরা টাকা চেনে আর মুনাফা চেনে, শাড়ির কাজ চেনে না। আর প্রয়োজন মিটে গেলে আমার বাবাকেও চিনতে পারে না।

আমাকে সুন্দর করে মাড় দিয়ে পাট করে আমার বাকি বোনেদের সঙ্গে দেয়াল আলমারির তাকে তুলে রেখে দিয়েছিল মা। মেয়েরা বড় হয়ে গেলে তাদের বেশি দিন ঘরে রাখতে নেই, এ কথা তো আর নতুন নয়। যতদিন বাপের ঘরে পড়ে থাকি, আমরা বোঝা ছাড়া আর কিছু না। আবার বেশি দিন পড়ে থাকলে আমাদের দাম আর কদর দুই কমতে থাকে। পাড়া পড়শী বাবা মাকে দুঃখ করে কথা শুনিয়ে যায়। লোকজন দেখতে এসে আমাদের পছন্দ করে তাদের ঘরে নিয়ে গেলে তবেই না আমাদের জন্ম সার্থক। আমি জানতাম আমার কপালে সেরকমই লেখা আছে। কিন্তু কেন জানি না, আমার বাবা একদিন আমাকে বোনেদের থেকে আলাদা করে শোবার ঘরের মরচে ধরা আলমারিতে সযত্নে তুলে রাখলেন। মা জিজ্ঞাসা করতে বললেন, “ঐটে থাক। ফাল্গুন মাসে একটা বে-বাড়ি আসছে। বড় বাড়ির অনুষ্ঠান। ভালো উপহার দিতে লাগবে।”

শিরশিরে উত্তুরে বাতাস তাড়িয়ে ফাল্গুন মাস এল। তার সঙ্গেই হঠাৎ করে আমাদের দেশে এক নতুন বিদেশী রোগ এল। কাশি, জ্বর, শ্বাস কষ্ট হয়ে নাকি শয়ে শয়ে মানুষ মরছে। মানুষে মানুষে রোগ ছড়াচ্ছে দ্রুত। রোগ মহামারীর আকার ধারণ করেছে। আস্তে আস্তে দেখলাম আমাদের বাড়িতে সকলের আসা বন্ধ হয়ে গেল। গ্রামের লোকজন আতঙ্কিত হয়ে সবাই ঘরবন্দী। বাবাদের ব্যবসাও হুট করে বন্ধ হয়ে গেল। শুধু ব্যবসা বন্ধ নয়, বড় বড় দোকান-পাট, বাজার বন্ধ। স্কুল, কলেজ, অফিস বন্ধ। রাস্তায় গাড়ি ঘোড়া বন্ধ, ট্রেন-বাস সব বন্ধ। খোলা বলতে খালি হাসপাতাল, ওষুধের দোকান আর মুদিখানা। পাড়ার কমবয়সী ছেলে মেয়েরা মাঝে মাঝে চাল-ডাল, তেল-আলু এসব দিয়ে যেত। সবার মুখেই এখন মুখোশ পরতে হবে। নাহলে পুলিশ মারবে। পুলিশ টহল দিয়ে দেখে যেত রাস্তায় কেউ জটলা করছে কিনা। যৎসামান্য জমানো টাকা আর মা-এর চার আনা সোনার কানের দুল বেচে ক’মাস সংসার চলল। ছয় মাস যেতে না যেতেই বাবার হাত একেবারে খালি হয়ে গেল। মা ঠাকুর ঘরে রোজ কাঁদত, কী করে সংসার চলবে সেই ভেবে।

প্রায় নয় মাস পর মা-এর চোখের জল আর শরীর যখন অর্ধেক শুকিয়ে এসেছে, তখন বুঝি ভগবানের পাথর মনে একটু দয়া হল। ততদিনে মহামারীর প্রথম ঢেউ সামলে উঠেছে দেশ। একটু একটু করে বাস অটো চালু হচ্ছে। খুব অল্প সময়ের জন্য হলেও দোকান পাট খুলছে। একদিন বাবাকে বলতে শুনলাম, কলকাতায় যেতে হবে। একসঙ্গে পঁচিশটা তত্ত্বের শাড়ির অর্ডার হয়েছে। বাবার এক বড় খরিদ্দারের ছেলের বিয়ে। কলকাতার বুকে তাদের বড় দোকান আছে। যে বিয়ের অনুষ্ঠান মহামারীর জন্য বাতিল হয়ে গিয়েছিল, আবার ছোট করে সেই অনুষ্ঠান হবে। মা চিন্তিত হয়ে বাবাকে বলল, “হ্যাঁ গো, এমন অবস্থায় যাওয়া কি ঠিক হবে ? সরকার বলছে কোনো জমায়েত অনুষ্ঠানে না যেতে। লোকজনের সঙ্গে বেশি মেলামেশা না করতে। বাবা আস্তে আস্তে বলল, “যেতে হবে গো। বিয়ে বাড়িতে যাওয়াটা বড় কথা না। আমার হাত যে একেবারে খালি। শাড়ি বেচলে কয়েক মাস অন্তত দু’বেলা দুমুঠো খেয়ে বাঁচব। বাবুকে এখন না করে দিলে পরে যখন ব্যবসা শুরু হবে তখন অর্ডার পাব না।“ মা আর কিছু বলেনি। আলমারি থেকে আমাকে বের করে বিছানার গদির তলায় রাখা একটা ভালো প্লাস্টিকে মুড়ে বাবার ব্যাগে ঢুকিয়ে রেখেছিলেন।

প্রায় সপ্তাহ তিনেক পর সেই বড়লোকের বিয়েবাড়ি দেখার সৌভাগ্য হল আমার। সে কী বিরাট বাড়ি তাদের! যেন রাজপ্রাসাদ। ওদের বৈঠক ঘরের চেয়ে আমাদের গোটা বাড়িটা ছোট মনে হচ্ছে। আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম, বড়লোকের বিয়ে বাড়ির অতিথি হয়ে বাবা কেমন কুন্ঠিত বোধ করছিলেন। বৌভাতের দিন বিকেল থেকে বুকের কাছে আমাকে আঁকড়ে রেখেছিলেন। মুখের মুখোশের আড়ালে বাবার উদ্বিগ্নভরা শ্বাস প্রশ্বাস শুনতে পাচ্ছিলাম। বিয়ে বাড়িতে প্রচুর মানুষের ভিড়। আড্ডা আনন্দ খাওয়া দাওয়ার ধুম দেখে মনেই হবে না যে মাস খানেক আগে দেশে অতিমারী বলে কিছুর অস্তিত্ব ছিল। ভিড় কিছুটা হালকা হতে লোক চক্ষুর থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে বাবা আমাকে নতুন বউয়ের হাতে তুলে দিলেন। তারপর বাবা খাওয়া দাওয়া সেরে কবে কখন বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল জানি না। আমার সঙ্গে বাবার সম্পর্ক ওখানেই শেষ।

প্যাকেট বন্দী হয়ে আমি এসে পৌঁছালাম নতুন বউয়ের ফুলসজ্জার ঘরে। ও মা ! কত বড় আর কত সুন্দর করে সাজানো ঘর। বনেদী আসবাব আর দামী জিনিস দেখে তাক লেগে যায়। রজনীগন্ধার মাতাল করা সুবাস আর একরাশ উত্তেজনা মিশে সে ঘরের বাতাস ভারি হয়ে আছে। আজ যে নতুন বউয়ের সোহাগ ভরা রাত! বউটার কী সোনার কপাল! কত বড় ঘরে বিয়ে হয়েছে। নতুন বউ গা ভর্তি গয়না নিয়ে ঘরে এল। সঙ্গে যে মাসিমা এসে ছিলেন তিনি নতুন বউকে শাড়ি পাল্টে নিতে বললেন। আমারও কী সৌভাগ্য! এটা ওটা বাক্স ঘেঁটে নতুন বউ আমাকে খুঁজে বের করল। প্লাস্টিকের ফাঁক দিয়ে আমাকে দেখে বোধহয় খুব মনে ধরেছিল। নতুন বউয়ের মনের ইচ্ছে ঠাওর করতে পারছি। সে আজকেই আমাকে গায়ে জড়াতে চায়। নতুন বউয়ের গায়ে জড়িয়ে গোলাপের পাপড়ি ছড়ানো সুসজ্জিত পরিপাটি বিছানার একপাশে আমি বসে রইলাম। প্রথম রাত বলে কথা! নতুন বউয়ের সঙ্গে আমার উত্তেজনার পারদ চড়ছে। আমিও ঘামে ভিজে যাচ্ছিলাম। বন্ধ দুয়ারের ভিতরের ভালোবাসাবাসির অভিজ্ঞতা আমারও প্রথম। কয়েক মুহূর্তের অপেক্ষা, তারপর পাঞ্জাবি পরিহিত সুপুরুষ বেশে তিনি এলেন। নতুন বউয়ের সঙ্গে চাপা স্বরে কিছুক্ষণ ফিসফাস করতে করতে হঠাৎ আমার আঁচলে আলতো টান দিলেন। আজ আঁচল খসে পড়ার রাত। যতটা সময় ধরে যত্ন করে নতুন বউ আমাকে গায়ে জড়িয়েছিল তার দশ ভাগের একভাগ সময়ে আমাকে টেনেটুনে তার সঙ্গিনীর থেকে ছাড়িয়ে আলাদা করে দিল নতুন বর। এত তাড়া কীসের বুঝি না। সেই মধুরাতে শঙ্খলাগা দুই মানব মানবীর শরীরী সোহাগের সাক্ষী হয়ে আমি সারারাত লুটিয়ে রইলাম মৃদু ছন্দে দুলতে থাকা পালঙ্কে।

তারপর বেশ কিছুদিন আমি আলমারি বন্দী হয়ে অপেক্ষা করছিলাম, কবে আবার আমার কপাল খুলবে, কবে নতুন বউ আবার আমাকে গায়ে জড়াবে। সে রাতটার কথা মনে পড়লে এখনও আমার কনক চাঁপার বরন জমি অলীক সুখে রাঙা হয়ে যেতে চায়। কয়েকদিন পর আশে পাশে গুঞ্জন শুনলাম, বাড়ির অনেকেরই নাকি শরীর ভালো নেই। আমার নতুন বন্ধু কলমকারী কেচে পরিপাটি হয়ে আলমারিতে এসে খবর দিল। নতুন বরের তিন দিন ধরে ধুম জ্বর। মুখে স্বাদ নেই, নাকে গন্ধ পাচ্ছে না। আমার বাবার মতোই শ্বাস নিতে তার কষ্ট হচ্ছে। বরকে নাকি আলাদা ঘরে রেখে দিয়েছে। কাউকে সেখানে ঢুকতে দিচ্ছে না। নতুন বউও তার কাছে যেতে পারছে না বলে বেচারী খুব কাঁদছে। নতুন বউয়ের দুঃখের কথা শুনে আমার মনটা বড় খারাপ হয়ে গেল।

একদিন মাঝ রাতে হঠাৎ কান্নার রোল উঠল। আমরা সকলেই খবরটা শুনে থমকে গেলাম। নতুন বউয়ের কপাল ভেঙেছে। সিঁথিতে সদ্য ওঠা লাল টকটকে সিঁদুর মুছে গেছে। অতিমারীর দ্বিতীয় ঢেউ আবার গ্রাস করতে শুরু করেছে মানুষের প্রাণ। নতুন বউয়ের প্রিয় মানুষকে সে খেয়ে বসে আছে। নতুন বউ কাঁদছে না, থম মেরে বসে আছে। বিশ্বাসই করতে পারছে না গতকাল যে মানুষটা ছিল, আজ সে নেই। সে নেই হয়ে গেছে চিরদিনের জন্য। শোক বুঝে ওঠার আগেই শ্বশুরবাড়ির লোক তাকে গায়ে ঠেলা দিয়ে অপয়া বলতে শুরু করে দিয়েছে। ওদের মতে, অপয়া না হলে বিয়ের পনের দিনের মধ্যে কারুর বর মরে নাকি? ঘটা করে বরণ করে ঘরে তোলা অলক্ষীর আর মুখ দেখতে চায় না শাশুড়ি। নতুন বউকে নোড়া ধরে চিরদিনের জন্য বাপের বাড়ি বসিয়ে দিয়ে আসতে বলেছে।

একদিন কাকভোরে যখন সবার চোখে আলগা ঘুমের ঘোর লেগে থাকে, হঠাৎ দেখি আমার গায়ে টান পড়ল। নতুন বউ আলমারী থেকে এক টান মেরে আমাকে বের করে মেঝেতে ছড়িয়ে পাকাতে লাগল। নতুন বউয়ের কি মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি? কী করতে চাইছে ও? হায় ভগবান ! আমি কি ফ্যানে ঝোলাবার জিনিস? ওমা, বলতে বলতেই দেখি নিমেষের মধ্যে এক মারাত্মক কান্ড বাধিয়ে বসল নতুন বউ। আমার গায়ে জোর টান পড়ল আর নতুন বউ বিস্ফারিত চোখে ছটফট করতে লাগল। বিশ্বাস কর, প্রচন্ড যন্ত্রনায় আমার ইচ্ছা হচ্ছিল যেন আমি ছিঁড়ে মাটিতে পড়ে যাই। কিন্তু বাবার সততা যে আমাকে ভালো সুতোয় গড়েছে। কিছুক্ষণ ছটফটিয়ে একেবারে পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে গেল নতুন বউ। নতুন বউয়ের দেহভার নিয়ে টানটান হয়ে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম আমি। মনে মনে ঈশ্বরকে চিত্কার করে জিজ্ঞাসা করলাম, “আজ যে অপয়ার দায়ভার আমাকে দিয়ে বহন করালে, তার দায় আসলে কার? উত্তর দাও, কার?”

কপিরাইট : পল্লবী পাল

প্রথম প্রকাশ: স্লেট-পেন্সিল বইমেলা সংখ্যা ২০২১

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top