নামগোত্রহীন

নামগোত্রহীন

সম্পর্ক জিনিসটা ভীষণ আশ্চর্যের। সে অদৃশ্য, পঞ্চইন্দ্রিয়ের কোনোটা দিয়েই একে অনুভব করা যায় না । ইংরেজিতে যাকে বলে ‘অ্যাবস্ট্রাক্ট নাউন’। কিন্তু প্রতিটি মানুষের জীবনে তার অস্তিত্ব সে প্রবলভাবে জানান দেয় প্রতি মুহূর্তে। পৃথিবীর আলো দেখার সঙ্গে সঙ্গেই কতগুলো সম্পর্কের জন্ম হয়ে যায়, তারপর একটু একটু করে ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় আরো কতরকম সম্পর্কের জালে জড়িয়ে পড়ে জীবন, চলে তার ভাঙা আর গড়া। কতরকম তার প্রকারভেদ – কাছের, দূরের, পারিবারিক, বৈবাহিক, পেশাগত, মিত্রতার, শত্রূতার, ভালোলাগার, ভালোবাসার, ঘৃণার… । এরই মধ্যে কিছু সম্পর্ক আবার নাম গোত্রহীন ভাবে থেকে যায় চিলেকোঠার ঘরের রংচটা আয়নার মতো, হঠাৎ কোনোদিন সামনা সামনি হলে সে প্রতিচ্ছবির মতো স্পষ্ট ফুটে ওঠে। জীবনটা সত্যি একটা রঙ্গমঞ্চ। হঠাৎ করে কলাকুশলীর আসা যাওয়া ঘটনা প্রবাহের দিক কেমন বদলে দেয় তাই না? অনিমেষ আর শ্রমণার জীবনে একরকম আচমকাই এসে পড়েছিল তথাগত, একটা নাম গোত্রহীন সম্পর্ক হয়ে।

অনিমেষ মিত্র দক্ষিণ কলকাতার এক বনেদী বাড়ির সন্তান। যদিও আদ্যিকালের ভগ্নপ্রায় বাড়ি, মিত্র পদবী আর বংশের প্রছন্ন অহংটা ছাড়া সেরকম কোনো বনেদীয়ানার চিহ্ন ব্যাংকের উচ্চপদস্থ অফিসার অনিমেষের মধ্যে আজ আর বর্তমান নেই। শ্রমণা যখন স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে জড়িয়ে ওর হাত ধরে মিত্রবাড়ির বৌ হয়ে আসে, তখন আধুনিকতা আর বিলাসিতার সব ছোঁয়াই লেগেছে অনিমেষদের আপাত নতুন বাড়িতে। রিটায়ার্ড শশুরমশাই, অসুস্থ শাশুড়ি, কর্মব্যস্ত স্বামী আর দুই সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে সংসার করতে করতে এই নতুন বাড়িই ওর মতোই আজ পঁচিশ বছর পুরোনো। শাশুড়িমার মৃত্যুর পর মিত্র বাড়ির বনেদীয়ানার চিহ্ন হিসাবে কিছু গয়না অবশ্য এখন শ্রমণার কাছেই আছে, আর আছে পারিবারিক ভাগ বাটোয়ারায় পাওয়া পুজোর বাসন কোসন। ওই বাড়ির সঙ্গে স্মৃতিবিজড়িত মানুষগুলি একে একে পুরোনো দেয়ালের মতোই ধসে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। শশুরমশাইও গত হয়েছেন বছর খানেক আগে। শ্রমণার মেয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত। বাইরে কর্মরত, সেখানেই তার সংসার। পড়াশোনার জন্য ছেলেও বিদেশে। অনিমেষের চাকরি জীবনের হাতে গোনা কয়েক বছর পড়ে আছে। এই বাড়িতে শুধু এখন ওরা দুটি প্রাণ, মধ্যবয়সের সংসারযাপনে ব্যস্ত।

পুরোনো মিত্র বাড়ির কথা শ্রমণা ভুলতেই বসেছিল। একদিন ডিনার শেষে বিছানায় শোবার পর অনিমেষই পুরোনো বাড়ির প্রসঙ্গ আনে। কারণটাও ভীষণ চেনা। সমস্ত শরিক বিক্রি করবে এ বাড়ি। পুরোনো বাড়ির শবদেহে নবজন্ম নেবে আকাশছোঁয়া বহুতল। টাকার অঙ্ক কত, কার ভাগে কত আসবে সেই নিয়েই ইদানিং শরিকদের মধ্যে আলাপ আলোচনা চলছে। অনিমেষের সঙ্গে আজকাল দরকারি আলোচনা বিছানায় শুয়েই হয়। ঘুমানোর আগের কয়েক মিনিট মাত্র। পঁচিশ বছরের দাম্পত্যে অভ্যস্ত শরীরে সে উষ্ণতা আর কোথায়? নির্লিপ্ততাই আঁকড়ে থাকে বেশি। সে অর্থে অনিমেষ কোনো কালেই দামাল প্রেমিক ছিল না। নববধূ শ্রমণার চোখে যে ভালোবাসার জোয়ারে ভাসার স্বপ্ন ছিল তার মৃদু তরঙ্গ কোনোদিনই ওকে সিক্ত করতে পারেনি, না শরীরে না মনে। কথায় কথায় রাত ফুরিয়ে যায় এমন ভালোবাসার উষ্ণতায় ভরা রাত কখনোই আসেনি। শ্রমণার শরীর ও মনের তৃপ্তি বরাবরই আড়াল থেকে গেছে অনিমেষের স্ট্রেস রিলিফের দ্রুত রতিক্রিয়ায় বা বংশগতির দায়িত্বে। অনিমেষ ক্লাস, স্ট্যাটাস, পার্সোনালিটি মেন্টেন করা কম কথার মানুষ। একটু কাটখোট্টা, হিসেবি। বেশিই প্র্যাকটিকাল। পেশার ক্ষেত্রেই হোক আর পেশার বাইরে, লাভ ক্ষতির অঙ্কটা অনিমেষ বরাবরই ভালো বোঝে। আজকে শ্রমণার সঙ্গে কথা বলতে বেশ আগ্রহ দেখালো অনিমেষ। পরিপাটি বিছানায় মাথার বালিশের মধ্যের ফাঁকটুকু কমিয়ে শ্রমণার গা ঘেঁষেই আলোচনা শুরু হল।

—বুঝলে, বাড়িটার ডিলটা ভালোয় ভালোয় হয়ে যাবে মনে হচ্ছে। ইনভেস্টর এর অফার করা টাকার অঙ্কটাও মন্দ না। আমাদের ভাগে যা আসবে তাতে তাতানের এডুকেশন লোনটা শোধ হয়েও অনেকটাই হাতে থাকছে। আর বছর ছয়েক পর আমার রিটায়ারমেন্ট। বেশ কিছু টাকা তখন আবার হাতে আসবে। আমার অন্তত ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশেষ চিন্তার কিছু নেই। পেনশনও থাকলো, হাতে লিকুইড ক্যাশ। অন্তত দুম করে বড়ো অসুখ হলে চিন্তা থাকবে না।

বৈষয়িক আলোচনায় শ্রমণা কোনোদিনই মতামত দেয়নি। বলা ভালো ওর থেকে কেউই মতামত চাওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। ছেলেমেয়ের স্কুল, পড়াশোনা, টাকাপয়সা, বৈষয়িক সম্পত্তির সিদ্ধান্তগুলো অনিমেষ বরাবর নিজেই নিয়ে এসেছে। অনিমেষের মতে ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিয়ে গেছে শ্রমণা। আজও সেই একই ভাবে উত্তর দিল,

—হ্যাঁ ।

—সামনের শুক্রবার আবার সবাই প্রোমোটারকে নিয়ে আলোচনায় বসবে। সবার অংশ অনুযায়ী ফ্ল্যাট কিরকম কি দেবে সেই সব নিয়ে কথা হবে। কয়েকঘর দুঘর শরিক ছাড়া আর কেউ বাস করে না, তাই ওরা এক কথায় রাজি। ভাড়াটেগুলো রফা করে উঠে গেলেই ঝামেলা মুক্তি। কেন যে দু পয়সার জন্য এদেরকে বসায় কে জানে। যত সব লোয়ার ক্লাস ঝামেলাবাজ পাবলিক এসে জোটে…

অনিমেষের বিরক্তিতে আভিজাত্যহীনতার প্রচ্ছন্ন ঘৃণা। শ্রমণা অনিমেষের এই স্বভাবটির সঙ্গে খুব বেশি পরিচিত। আর্থিকভাবে দুর্বল আত্মীয় পরিজন এই বাড়িতে এলে তাদের আদরযত্নে কথাবার্তায় এই বৈষম্য আগেও দেখেছে। বিয়ের পর পর শ্রমণার বাড়ি থেকে আসা প্রথম দিকের উপহারের শার্টগুলো এর সাক্ষী আছে, পরে যদিও শ্রমণা অনিমেষের পছন্দের ইঙ্গিত জানিয়ে দিয়েছিল বাড়িতে। বিবাহবার্ষিকী, জন্মদিন, জামাই ষষ্ঠী আর পুজোর তত্ত্বের বদলে শুধু জামাইষষ্ঠী আর পুজোর তত্ত্বই আসতো। অভিজাত বংশে বিয়ে হয়ে এসে থেকে কনের হালকা গলার হার, জামাইয়ের প্যত্পাতে আংটি, নাতি নাতনির অন্নপ্রাশনে দাদু দিদার দেয়া আশীর্বাদী ফিনফিনে সোনার হার নিয়ে বিদ্রুপ আড়াল থেকে কম শোনেনি। এসব কিছু শ্রমণার কাছে মাছের কড়াইয়ের তেল ছিটে আসার মতোই গা সওয়া হয়ে গেছে। শ্রমণা কাঁধের ওপর অনিমেষের হাতের ছোঁয়া পেল ।

—এই শুক্রবার তুমি আমার সঙ্গে যেও। একবার দেখে আসবে এককালে এই বংশের কী রমরমা ছিল। আমাদের ওই বাড়ির লোকেশনটা তো খারাপ নয়, কমপ্লেক্স উঠলে ভালোই দাম হবে। মডার্ন ফেসিলিটিস থাকবে। ফ্ল্যাটটা তাতানকে বিয়ের উপহার হিসাবে দিয়ে দেয়া যাবে, কি বলো? শশুরবাড়ির লোকেদের চোখে তাক লেগে যাবে। হে হে !

শ্রমণা নিরুত্তাপ।

—শুক্রবার তুমি অফিস যাবে না ?

—না, অফিস যাব না ঐদিন। ব্রেকফাস্ট করেই বেরিয়ে পড়ব দুজনে।

—ঠিক আছে।

অনিমেষ স্বস্তির নিঃস্বাস ফেলে টানটান হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল।

—এটা হয়ে গেলে আমিও নিশ্চিন্ত। তাতানের এডুকেশন লোনটাও শোধ হয়ে যাবে। মুনাই এর জন্য এমনিতেই চিন্তা নেই, ও দাঁড়িয়ে গেছে। মুনাইয়ের বর সঞ্জীবের নিজেরই দু দুটো ফ্ল্যাট। ও আসবেও না ভাগ নিতে। আমি তবুও ওদের ছেলে মেয়ে হলে কিছু টাকা গিফট হিসাবে দেব, তাহলে আর কথা বলার জায়গাও থাকবে না। তাতানের জন্য ফ্ল্যাটটা থাক, বিলেতের ডিগ্রির তকমা পড়ে গেলে মোটা মাইনের চাকরি অনায়াসেই পেয়ে যাবে। এই পুরো বাড়ি থাকল তোমার, আমি না থাকলেও আমার এতো বছরের হাড়ভাঙ্গা খাটনির জন্য বসে বসেই তুমি অর্ধেক পেনশন পাবে। মানতেই হবে তোমার বাবা বেশ বিচক্ষণ মানুষ ছিলেন, মেয়েকে ভেবেচিন্তে ঠিক লোকের হাতেই তুলে দিয়েছিলেন। সরকারি চাকুরের বৌ হয়ে সারাজীবন তো আরামেই কাটালে, শেষ জীবনটা তোমার সুখেই কাটবে।

সুখের সংজ্ঞাটা বোধহয় সবার কাছে সমান নয়। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ম্যানেজারের স্ত্রী শ্রমণা, সে খারাপ থাকতেই পারে না। সত্যি বলতে দুবেলা দুমুটো ভাত জোটানোর অভাব কোনোদিনই তাকে স্পর্শ করেনি। অভিজাত বংশ, স্বচ্ছল জীবন, দামি দামি জিনিসে সাজানো সংসার এটাই তো মনে হয় সুখ, এরকম ক্লাসি জীবনই তো শ্রমণা চেয়েছিল। এতো সুখ স্বাছন্দের মধ্যেও শ্রমণার মনের কোনায় কোথাও একটা শুন্যতা আছে। সেটা টের পায় মাঝে মাঝে। শুধু কারণটা শ্রমণা খুঁজে পায় না। হয়তো নিজেও ঠিক করে বোঝে না, কাউকে বোঝাতে পারে না। বহুদিনের বন্ধু সাগরিকাকে মনের কথা একদিন সাহস করে বলেছিল। ওর মতে এসব নাকি মেনোপজের সাইড এফেক্ট। শ্রমণা ভাবে, তাই হবে হয়ত !

বিয়ের এই এত বছর পর অনিমেষের সঙ্গে এই পুরোনো বাড়িতে আসা। এককালে যে এবাড়ির বিত্ত ও প্রতিপত্তি ছিল তা প্রাসাদোপম বাড়ির ভগ্নদশা দেখলেও অনুমান করা যায়। আজকে না এলে আর কোনোদিন দেখতেও পেতো না শশুরবাড়ির এই শিকড়ের নিদর্শন। শ্রমণা অবাক চোখে জরাজীর্ণ বাড়ির চারপাশ দেখতে থাকে, বাড়িটার সত্যিই করুন অবস্থা। বিপদজনকও বটে। বড়ো বড়ো থামের দেয়ালের থেকে খসে গেছে পলেস্তরা। কোথাও নোনা ধরা ইট দাঁত বার করে একসময়ের আভিজাত্যের ক্রমাগত বিদ্রুপ করে। ঠাকুর দালানময় শ্যাওলার নকশা। দক্ষিণদিকের অংশের করিবর্গা ভেঙে ঝাড়বাতির মতো ঝুলছে। সারা বাড়িময় স্যাতস্যাতে ভ্যাপ্সানি পূতিগন্ধ। ঘুন ধরা কাঠের জানলা দরজা আর দেয়ালে মনের সুখে উই তার বাসার শাখা প্রশাখা ছড়িয়েছে। সিঁড়িতে পা দিতেই মচমচ শব্দ হওয়াতে দোতলায় ওঠার আর সাহস পায়না শ্রমণা। একতলাটা ঘুরে দেখার সময় এক দুই ঘর বাসিন্দা নজরে এল। ভাড়াটেই হবে মনে হয়।

বাকি শরিকরা ও তাদের প্রতিনিধিরাও একে একে আসতে শুরু করেছে। সবাইকে শ্রমণা চেনে না, কিছু মুখ পরিচিত। শশুরমশাইয়ের শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে যাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল তাদেরকে মনে আছে। কারোর সঙ্গেই অনিমেষের সেরকম হৃদ্যতা নেই। ওই সৌজন্য রাখার জন্য যেটুকু না রাখলে নয় সেটুকুই সম্পর্ক রাখে। অনিমেষ কাজের কথা ছাড়া কাউকে বিশেষ ফোন করে না। অন্যরাও যে খুব করে তাও নয়। মেজ জ্যাঠা, সেজ কাকু, ছোট কাকিমা আর মেজপিসির পরিবারের সঙ্গে তবু ভালোমতো আলাপ আছে ওর, ওদের অবস্থা বেশ ভালো। শ্রমণার সঙ্গে টুকটাক কুশল বিনিময় হল চেনা মুখগুলোর সঙ্গেই।

ভিতরের বৈঠকঘরে এখন বৈষয়িক আলোচনা চলছে। শ্রমণা বাইরেই স্বছন্দ বোধ করছে। তাই এদিক ওদিক ঘুরেই সময় কাটাচ্ছে। শ্রমণা হঠাৎ একটা চেনা অথচ যেন অপরিচিত মুখকে মূল ফটক পেরিয়ে ভিতরে আসতে দেখে থমকে যায়। মুখোমুখি হতেই কয়েক মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেল শ্রমণা। মুখটা ভীষণ চেনা, চোখদুটো বিশেষ করে। শ্রমণা স্মৃতি হাতড়ে চেনা মুখের সন্ধান করে। কিন্তু স্মৃতি ওকে যার কথা মনে করাচ্ছে সে এখানে কেন আসবে? ও কি ঠিক দেখছে? উনিও শ্রমণার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। শ্রমণা কথা বলবে কিনা সেইভেবে ইতস্তত করছে। শ্রমণার দোনোমোনোটা সেই ব্যক্তি নিজে থেকে এসেই কাটিয়ে দিলেন।

—যদি খুব ভুল না করি, তুমি কি শ্রমণা? ভাস্কর স্যারের মেয়ে?

গলারস্বর শোনা মাত্রই শ্রমণা চমকে গেলেও বুঝতে পারে ও যার কথা ভাবছিল, ইনিই তিনি। এই স্বর যে ওর ভীষণ পরিচিত ছিল একসময়।

—হ্যাঁ…আমি শ্রমণা, তুমি…

—চিনতে পারছ আমাকে? চিনতে না পারাটাই স্বাভাবিক। অনেকদিন আগের কথা…

শ্রমণা অস্ফুট স্বরে বলে,

—তথাগত দা !

—আমার নাম মনে আছে তোমার ? আমি ভাবলাম চিনতে পারবে না।

—হ্যাঁ, মনে আছে।

ভদ্রলোক স্মিত হাসলেন।

—ভাস্কর স্যার, সুদেষ্ণা দিদিমনির কথা খুব মনে পড়ে, এখনও।

—অনেকদিন হল বাবা মা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।

—হ্যাঁ জানি, খবরাখবর নিতাম। ওঁরা যেখানে গেছেন সেখানে ভালো আছেন মনে হয়। ভীষণ ভালো মানুষ ছিলেন দুজনেই। এখনো মনে হয় এই তো সেদিনকার কথা। আসলে পুরোনো কথা মনে পড়লে নিজের বয়সের দিকটা খেয়াল থাকে না, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ধূসর মাথা আর মুখের বলিরেখা দেখলে মনে পড়ে আমার বয়স হয়েছে।

—চেহারা পাল্টে গেলেও তোমার মুখএকই রকম আছে। চোখ, মুখ, হাসি…

— তোমার সঙ্গে বোধহয় ত্রিশ বছর পর দেখা তাই না ?

—হ্যাঁ, তা হবে। অনেকদিন পর…

—অনেকদিন পর…যাই হোক, তুমি ভালো আছ তো?

তথাগতর চোখের দিকে তাকাতেই শ্রমণার সেই ত্রিশ বছর পুরোনো সংকোচটা আবার ফিরে এলো। এমন কিছু পুরোনো স্মৃতি থাকে যা আড়াল রাখা যায়, কিন্তু ভুলে যাওয়া যায় না। শ্রমণা সংকোচটাকে আড়াল করে স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করছে।

—আমি ভালো আছি। কিন্তু তুমি এখানে.. মানে… ?

‘গুড মর্নিং, মিস্টার বিশ্বাস’ অনিমেষের শুভেচ্ছায় শ্রমণা আর তথাগতের কথোপকথনে ছেদ পড়ল। তথাগত ঘুরে তাকালো।

—ওহ হ্যালো! মিস্টার মিত্র। আপনাদের আলোচনা এগিয়েছে ?

—হ্যাঁ কিছুটা, এই আপনার অপেক্ষাতেই আছি আমরা, আসুন প্লিজ ।

তথাগত শ্রমণার দিকে তাকিয়ে বলল,

—অনেকদিন পর এনার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল, পুরোনো কথায় আটকে গেলাম।

অনিমেষ ভ্রু কুঁচকে শ্রমণার দিকে তাকিয়ে তথাগতকে প্রশ্ন করল,

—শ্রমণা আপনার পরিচিত?

—একসময়ে খুব পরিচিতি ছিল। ভাবতেই পারিনি এতদিন পর এভাবে দেখা হবে।

—তাই নাকি? এ তো খুব ভালো ব্যাপার। শ্রমণা, তুমি আগে বলোনি তো তুমি তথাগত বাবুকে চেন…

শ্রমণা জানে এটা অবান্তর প্রশ্ন। অনিমেষের কাজের জায়গার কোনো মানুষের সঙ্গেই যে ওর বিশেষ পরিচিতি নেই সেটা দুজনেই ভালো করে জানে। কেন নেই সেটাও ভালো করে জানে। আর তথাগতর প্রসঙ্গ আসার কোনো সূত্রই নেই, তবুও বুঝতেই পারছে এই কথা অনিমেষ কেন ব্যবহার করল। তথাগত একটুও অবাক না হয়ে বলল,

—শ্রমণা আপনার আত্মীয় ?

—শুধু আত্মীয় নয়, আমার মিসেস।

— বাহ্, তাহলে সত্যি দারুন ব্যাপার। শ্রমণা, আমি তাহলে এখন কাজের কথা সেরে আসি। কথা হবে আবার…

‘তুমি ভিতরেও বসতে পারো শ্রমণা’, অনিমেষের আহ্বানে শ্রমণা মিত্র বাড়ির পুরোনো বৈঠকঘরের আলোচনায় এসে বসল। আলোচনাতে ওর মোটেই আগ্রহ নেই। শ্রমণা চোখ বার বার চলে যাচ্ছে তথাগতের দিকে। সেই বুদ্ধিদীপ্ত চোখ, পোশাকি পরিপাট্য থাকলেও স্ট্রাগল করে বড়ো হবার ছাপ এখনো মুখে রয়ে গেছে। কাঁচাপাকা চুল আর চোখের কোনের বলিরেখাগুলো বয়স জানান দেয় ঠিকই, কিন্তু ব্যক্তিত্ব ও নম্রতা সেই আগের মতোই আছে।

শ্রমণা ক্রমাগত স্মৃতির পর্দা সরিয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে। তথাগতকে যত দেখছে তত অবাক হচ্ছে। তথাগত বিশ্বাস… এই কি সেই মায়ের স্কুলের সামনে চায়ের দোকানে ফাইফরমাশ খেটে দেয়া বুধেনকাকার কুড়িয়ে পাওয়া পাতানো ছেলে? তথাগতকে শ্রমনা প্রথম দেখেছিল কৈশোরে। হাড়গিলে চেহারা, অন্যের দয়া করে দান করা বড়ো শার্ট প্যান্ট পরা। উস্কো খুস্কো চুল। রোগা চেহারায় মাথাটা বড়ো লাগত। নাকের নিচে হালকা গোফের রেখা। তবে ওর চোখটা ছিল বেশ চকচকে। শ্রমনাদের বাড়িতে শ্রমণার বাবার কাছে পড়তে আসা শুরু করেছিল। শ্রমণার মনে আছে, মা প্রথমদিনই বাবা কে বলেছিল, এই ছেলে কয়লাখনির কাঁচা হিরে, একে পড়িয়ে তুমি তৃপ্তি পাবে। বাবার ঘরে এক ব্যাচেই পড়তো সবাই, তথাগত এককোনায় গুটিয়ে বসে একমনে পড়া শুনত বা লিখত। বুকের দুটো বোতাম খোলা আর গলার কালো কারে একটা তোবড়ানো মাদুলি ঝুলছে। তথাগত’র জামাকাপড় ওর আর্থসামাজিক অবস্থার ফারাক স্পষ্ট করত। ওর পাশে বসা বাকি ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে ওর দূরত্ব এই ফারাকটা আরও স্পষ্ট করে দিত। কেউ কেউ ওর গালভরা নাম নিয়েও ঠাট্টা বিদ্রুপ করত। চায়ের দোকানে বাসন মজা ছেলের এতো ফ্যান্সি নাম কে দেয় ? পরের দয়া নিয়ে যে ছেলের মাথা নিচু করে চলার কথা, সে ছেলে এতো মাথা উঁচু করে চলে কেন? শ্রমণার মা বাবারই মনে হয় কোনো সমস্যা ছিল, কেন যে এই ছেলেটাকে এতো ভালোবাসতো কে জানে।

‘শ্রমণা এস’, অনিমেষের ডাকে স্মৃতিরপথ থেকে বর্তমানে ফিরল শ্রমণা। অনিমেষ জানালো, ‘টাকা ছাড়া আমাদের একটা 2 bhk পাচ্ছি। ওনারা দুটো অপশন দিচ্ছেন, ফিফ্থ আর ফার্স্ট ফ্লোর। ফার্স্ট ফ্লোর নেয়াটা ভালো হবে। ফায়ার এমার্জেন্সিতে উঠতে নামতে সুবিধা। প্ল্যান নয় পরে দেখে নেয়া যাবে।’ শ্রমণা সম্মতি দেয়। অনিমেষ এতক্ষন বেশ খাতির করছে তথাগতকে, নিজের ব্যাংকের কাজে দেখা করার জন্য বার বার এপয়েন্টমেন্ট এর কথা বলছে। এতক্ষনে তথাগতর এখানে আসার কারণ জানতে পারল শ্রমণা। তথাগত এই হাউসিং প্রজেক্ট কোম্পনির চিফ সিভিল ইঞ্জিনিয়ার আর ওয়ান অফ দা স্টেক হোল্ডার। কলকাতার টিমকে গাইড করবে তাই কয়েকমাসের জন্য এসেছে। লোকেশান দেখতে এসেছেন আজ। কথায় কথায় অনিমেষ যখন জানতে পারল তথাগত শ্রমণার বাবার প্রাক্তন ছাত্র, শ্রমনাদের বাড়িতেও একসময় অনেক যাতায়াত ছিল ওর চোখদুটো চকচক করে উঠল। তথাগতকে ফ্যামিলি রেফারেন্সে দুম করে বাড়িতেই ইনভাইট করে বসল অনিমেষ। শ্রমণা এতটাও আশা করেনি।

ঝোড়ো হাওয়ার থেকেও দ্রুত ছড়িয়ে ছিল উচ্চমাধ্যমিকে তথাগত’র জেলায় প্রথম আর রাজ্যে তৃতীয় স্থান পাবার খবরটা। তখন নিউজ মিডিয়ার বাড়াবাড়ি না থাকলেও তথাগত’র হাড়গিলে চেহারার পাসপোর্ট সাইজ ছবি বেরিয়েছিল প্রথমসারির নামী কাগজে। প্রশংসা আর আনন্দে ওকে বুকে জড়িয়ে নিয়েছিলেন শ্রমণার বাবা। ছোট্ট একটা মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে চোখের জল মুচ্ছিল বুধেন কাকা। ছেলের এতো ভালো রেজাল্ট দেখে সমস্যায় পড়ে গেছেন। একে আর পড়াবেন কী করে? পড়াশোনায় ভালো না হলেই যেন ভালো হত। হাতের কাজ শেখাবার জন্য কোনো কারখানায় কাজে লাগিয়ে দেয়া যেত। দু পয়সা আসলে তাতে টানাটানির সংসারের লাভ। তথাগতকে নিয়ে বাবা মায়ের মাতামাতিটা দেখে খুব চোখ টাটিয়েছিল শ্রমণার। যে ছেলেটা চায়ের দোকানে হাতে কেটলি নিয়ে চা দিত, যার সকলের করুনার পাত্র হয়ে থাকার কথা ছিল ক্রমশ তার সাফল্যটা সহজভাবে অনেকেই নিতে পারেনি। ফ্রায়েড রাইস আর চিলি চিকেন বানাবার তোরজোড় করতে করতে আজকের আমন্ত্রিত অতিথির অতীতের দিনগুলো নিয়েই ভাবছিল শ্রমণা।

বিগত কয়েকমাস অনিমেষ একটু বেশিই হৃদ্যতা দেখিয়েছে তথাগতকে। মাঝে মাঝেই শুকনো আলাপী ফোন, হালকা হাসাহাসি, শ্রমণার বাপের বাড়ির রেফারেন্স, শশুর শাশুড়ির প্রশংসা। তাতে লাভ যে কিছুটা হয়েছে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। দোতলার সেরা পজিশানের ফ্ল্যাটটা ওদের জন্যই এলোকেট করা হবে বলে কথা দিয়েছে বিল্ডার। নির্ধারিত প্রাপ্য স্কয়ারফিটের চেয়ে একটু বেশিই পাবে তাতে। অনিমেষের ব্যাংকের সঙ্গেও হাউসিং লোনের ব্যাপারে কাজ করতে রাজি হয়েছে কন্সট্রাক্সান কোম্পানি। কিন্তু এর মধ্যেও আবার শরিকি ঝামেলায় প্রজেক্ট নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে। অনিমেষের অংশ বিক্রির প্রাপ্য টাকাগুলো হাতে আসার ঠিক আগের মুহূর্তে আটকে যাওয়াতে বেশ টেনশানে পড়ে গেছে। তথাগতকে বার বার অনুরোধ করেছে অনিমেষ বাড়িতে আসার জন্য। নানা বাহানায় প্রতিবারই এড়িয়ে গেছে তথাগত। শেষে শ্রমণাকে দিয়ে অনুরোধ করাতে নিতান্তই ভদ্রতার খাতিরে তথাগত রাজি হয়েছে।

হঠাৎ উস্কে ওঠা ত্রিশ বছর আগের স্মৃতি আর সংকোচটা শ্রমণার জীবনে শুধু ফিরেই আসেনি, সেটা প্রতিনিয়ত অসোয়াস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সোফায় তথাগতের মুখোমুখি বসেও এই আসোয়াস্তিটা ভালোই টের পাচ্ছিল শ্রমণা। তথাগত বোধহয় সেটা খেয়াল করেছে। বারবার তাকাচ্ছিল শ্রমণার দিকে। ত্রিশ বছর আগের তথাগতের সঙ্গে আজকের তথাগতের অনেক পার্থক্য। দেশি বিদেশী ক্লায়েন্ট হ্যান্ডেল করা তথাগতর পোড় খাওয়া নজরকে ফাঁকি দেয়া অতো সহজ নয়। এখন মানুষ আর তার মন চিনতে ওর ভুল হয় না। শ্রমণা কাজের অছিলায় উঠে যেতে চাইছিল, কিন্তু অনিমেষই হাত ধরে বার বার বসিয়ে দিচ্ছিল, ‘তোমারই তো বাপের বাড়ির লোক, গল্প করো’। হুইস্কির গ্লাস হাতে অনিমেষের সঙ্গে তথাগতের কাজের বিষয়, পারিবারিক বিষয় সব নিয়েই কথাবার্তা চলছিল।

কনস্ট্রাকশন প্রজেক্টে এক শরিককে নিয়ে নাকি খুব সমস্যা চলছে। সে শরিক মিত্রবংশের কেউ না। একসময়ের নাকি কোন বাবুর বিশ্বস্ত চাকর ছিল। তার কিশোরী মেয়ের সঙ্গে নাকি মিত্র বংশের কোনো সুপুত্রের ভুলবশত বা অভ্যাসবশত শারীরিক সম্পর্ক হয়ে যায়, কুমারী মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে পড়ে। সেই ডিসাস্টার ম্যানেজ করতে নাকি মিত্রদের কোনো সদয় পূর্বপুরুষ মেয়েটির বাবাকে বাড়ির কিছু অংশ দান করেছিলেন। মেয়েটির অন্যত্র বিয়ের ব্যবস্থা করে দেন। সেই দানের ছাদটুকু মাথায় নিয়ে তাদের বংশধররাই তিন পুরুষ বাস করে আসছে। হালফিলে তারাই একটু পয়সার মুখ দেখেছে। নতুন বাড়ি করেছে। শরিকানা কম থাকায় আগে শুধু টাকা নিয়ে রফা করতে রাজি ছিল, এখন আবার অন্য শরিকদের মতো ফ্ল্যাট দাবি করছে। নাহলে কোর্টে মামলা করে ঝামেলা করবে বলছে। অনিমেষ সেই নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করছিল তথাগতর কাছে।

—জানেন তো মিস্টার বিশ্বাস, মানুষের এই বেইমান স্বভাবের জন্য আজকাল কেউ কাউকে দরকারেও সাহায্য করতে চায় না। কিছু মানুষ আছে যারা খেতে পেলেই শুতে চায়, উপকার পেয়ে উপকার ভুলে যায়। প্রতিদান তো দেবেই না, উল্টে যতটা দুয়ে নেয়া যায়। এরা যতই পড়াশোনা শিখুক ওই ফিলদি পুয়োর স্টমাক ধান্দাবাজির মানসিকতা থেকে কখনোই বেরোতে পারে না। ডিসগাস্টিং!

শ্রমণার চোখ তথাগতের দিকে স্থির হয়ে যায়। তথাগত হাতের খালি হুইস্কির গ্লাসটার দিকে তাকিয়ে একবার মুচকি হেসে সেটা টেবিলের ওপর রেখে দেয়।

অনিমেষের নেশাটা গাঢ় হয়েছে বুঝতে পারছে শ্রমণা, অন্যদিন এতটাও লিমিটের বাইরে খায় না। প্রজেক্টের টাকাটা আটকে যাবার পর থেকেই এক মাস যাবৎ চাপা টেনশানে ছিল অনিমেষ। শ্রমণা সেটা ভালো করেই জানে। শ্রমণার সদ্য পঞ্চাশ পেরোনো বাঁধনহীন শরীর ধ্বস্তিয়ে স্ট্রেস রিলিফের ব্যর্থ চেষ্টাও করেছে কয়েকবার। অনিমেষের ফ্রাস্ট্রেশান কমেনি, বরং দিনদিন আরও চিন্তা বেড়েছে। সেই ছাই চাপা ক্ষোভের আগুন আজ অনিমেষের মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। অসংলগ্ন কথাবার্তা চলতেই থাকে। আভিজাত্যের মুখোশের আড়ালের থাকা সংকীর্ণ মানসিকতা আর ক্ষুদ্র অহংগুলো প্রতি কথার সঙ্গে প্রচ্ছন্নে প্রকাশ পেতে থাকে। পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাবার আগেই শ্রমণা দুজনকেই অনুরোধ করে ডিনার সেরে নেবার জন্য।

তথাগত সম্মতি দেয়, উঠে পড়ে। অনিমেষ হ্যাঁ তে হ্যাঁ মিলিয়ে উঠে তো পড়ে, কিন্তু দু পা এগোবার পর আর টাল সামলাতে পারে না। হুইস্কি গ্লাস হাত থেকে পড়ে ভেঙে যায় আর অনিমেষ সোফায় লুটিয়ে পড়ে। দিনার টেবিলে বসার বা বসে ডিনার করার অবস্থাতেই নেই সে। ভাঙা গ্লাসের টুকরোগুলো তুলতে তুলতে লজ্জায় মাটিতে মিশে যাচ্ছে শ্রমণা। অনিমেষের মান আর হুশ দুটোই যেন ভাঙা হুইস্কির গ্লাসের মতোই ছড়িয়ে ছিটিয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। তথাগত সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল। দুজনে ধরাধরি করে অনিমেষকে বিছানায় শুইয়ে দেয়। এ সমস্ত কিছুর পর তথাগত না খেয়ে চলে যাওয়াই শ্রেয় মনে করেছিল। কিন্তু ছলছল চোখে শ্রমণার ডিনার করে যাবার অনুরোধ ফেলতে পারল না। শ্রমণা যে স্বাভাবিক নেই বুঝতে পারছে তথাগত। রাইস সারভিংয়ের সময় হাত কাঁপছে। বিদেশী কায়দায় সুসজ্জিত ডিনার টেবিলে খাবার সাজিয়ে দিয়ে শ্রমণা চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে তথাগতর পাশে। তথাগত একটু ইতস্তত করে বলে,

—তুমিও একসঙ্গে খেতে বস, ইটস প্রিটি লেট্। অনিমেষবাবু রেস্ট নিক।

—নাহ থাক, আমার খিদে নেই, তুমি খেয়ে নাও, আমি পরে খাব।

তথাগত কিছুক্ষন চুপ থেকে প্রশ্ন করে।

—তুমি কি এখনও আমার সঙ্গে একসঙ্গে বসতে ঘেন্না করো?

চমকে ওঠে শ্রমণা। তথাগতর প্রশ্নে ত্রিশ বছর আগের স্মৃতি শ্রমণার চোখের সামনে স্পষ্ট ভেসে ওঠে। তথাগতর সাফল্যে সবাই খুব খুশি ছিল, শ্রমণা ছাড়া। কারণ ওর নিজের মাঝারি মেধার সাধারণ রেজাল্ট তথাগতের চমৎকার রেজাল্টের প্রশংসা আর জৌলুসের কাছে প্রায় আট বছর ধরে ফিকে হতে হতে মিলিয়ে গিয়েছিল। নম্বর ভালো না থাকায় ভালো কলেজে চান্সও পায়নি। একটা নামি কলেজে ডোনেশন দিয়ে ভর্তি হবার সুযোগ এসেছিল, কিন্তু শ্রমণার বাবা নীতিগত কারণে রাজি হননি। এদিকে তথাগতর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি ফি এর একটা বড়ো অংশ দিয়েছিলেন শ্রমণার বাবা ও মা। ওর বাবাই চিঠি লিখে কাউন্সিলার বন্ধুর সাহায্যে এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার স্কলারশিপের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। একসময় শ্রমণার হিংসা, ঘেন্না আর রাগের অস্তিত্বই ছিল শুধুমাত্র তথাগতকে ঘিরে। আর্থসামাজিক বৈষম্যটা শ্রমণা অনেক আগে থেকেই ওকে ভালো করে বুঝিয়ে দিত। মা ওর জন্য খাবার পাঠালে কোনোদিনই তা ওর হাতে দেয়নি। অবহেলার ‘ঠক’ শব্দ করে পাশে নামিয়ে রাখত। জলের গ্লাসটা, চায়ের কাপটা আলাদা করে মার্ক করে রেখেছিল। কম অশান্তি ঝগড়া করেনি ওর প্রতি বাবা মায়ের এতো স্নেহ আর ভালোবাসা দেখে। অনার্স কেটে গিয়ে কোনোমতে গ্রাজুয়েশন পাশ করে শ্রমণা। তথাগতর বরাবরই চোখ ধাঁধানো রেজাল্ট আর ক্যাম্পাসিংয়ে চাকরিও পেয়ে যায় বড়ো কোম্পানিতে। বাড়ি বসে তথাগতর সাফল্যের খবর শুনতে শুনতে মাঝে মাঝে ভয় হত শ্রমণার, কোনদিন না ওর বাবা মা ওর সঙ্গে জন্মপরিচয়হীন তথাগতর বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসেন।

চাকরি পেয়ে ভিনরাজ্যে চলে যাবার আগে একদিন তথাগতকে বাড়িতে নিমন্ত্রণ করেছিল শ্রমণার বাবা মা। শ্রমণা ওকে নিচু দেখাবার শেষ সুযোগটা ছাড়েনি। সেদিনও একসঙ্গে ডাইনিং টেবিলে খেতে বসেছিলেন সবাই। শ্রমণার মা সুন্দর করে প্লেটে সাজিয়ে দিয়েছিলেন নিজের হাতে রান্না করা তথাগতর প্রিয় খাবার, চিলি চিকেন আর ফ্রায়েড রাইস। শ্রমণা তথাগতর পাশে বসতে চায়নি।

—বাবা… আমার খিদে নেই এখন, পরে খাব। তোমরা খেয়ে নাও।

—শ্রমণা…যদি খেতে হয় একসঙ্গেই বসে খাবে, নাহলে খাবার দরকার নেই। তোমাকে যেটা বলা হচ্ছে সেটা করো। চুপচাপ বসে খেয়ে নাও।

—বেশ ঠিক আছে, আমি এই দিকের চেয়ারে বসব। ওর পাশে বসব না। মা তুমি ওখানে উঠে বস।

ভাস্করবাবু শিক্ষকসুলভ ভারী গলায় মেয়েকে তিরস্কার করলেন,

—না, তুমি কোথাও যাবে না, তথাগতর পাশের চেয়ারেই বসবে।

শ্রমণার জেদ বাড়ে।

—সরি বাবা, ওর পাশে বসে খেতে আমার ভক্তি হয় না।

—কী ! কী বললে তুমি ? ভক্তি হয় না ?

শ্রমণা মনের মধ্যে জমা সমস্ত বিষ উগরে দিল,

—তোমরা একটা লোয়ার ক্লাস বেজন্মা ছেলেকে মাথায় তুলে নিয়ে মাতামাতি করতে পারো, আদিখ্যেতা করতে পারো। আমি পারি না। সরি। ডিগ্রি আর চাকরি পেলেই সবাই এক টেবিলে পাশে বসে খাবার যোগ্য হয় না। তোমার কথা মানতে আমি বাধ্য নই।

ভাস্করবাবু রাগে ফেটে পড়লেন।

—শ্রমণা ! এতো স্পর্ধা তোমার! আমরা তোমাকে এই শিক্ষা দিয়েছি ? ছি ! ছি! আজকে লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাচ্ছে। আর যোগ্যতা ? কী যোগ্যতা আছে তোমার ? তোমার এত অহং কিসের? মেধা আর মন দুটোতেই তুমিই তথাগতর নখের যোগ্য নয়। ওর থেকে অনেক অনেক নিচু, কী যেন বললে একটু আগে … হ্যাঁ, তোমার ভাষায় যাকে বলে লোয়ার ক্লাস।

‘আমার এখন এখান থেকে চলে যাওয়াই ঠিক হবে, আমি আসি স্যার।’ অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে তথাগত উঠে চলে যাবার উপক্রম করছিল। ভাস্করবাবু ওর হাত ধরে আটকে দিলেন।

—তথাগত, আমি খুব লজ্জিত। তোমার কাছে আমি আমার মেয়ে হয়ে হাত জোড় করে ক্ষমা চাইছি। তোমার মতো ভালো মনের মানুষকে যে চিনতে পারে না, এরকম অভদ্র আচরণ করতে পারে সে তোমার ক্ষমার অযোগ্য। তাও তুমি নিজ গুনে ওকে ক্ষমা করো।

শ্রমণা তখনও রাগে আহত নাগিনীর মতো ফুঁসছে ।

—থাক বাবা, কাউকে চেনাতে হবে না। আমি চিনি এরা কিরকম ধান্দাবাজ । তোমরা তো সরল মনে সকলকে নিজেদের মতো ভালো ভাব। তাই বোঝো না। এরা খেতে পেলে শুতে চায়। এতদিন তোমাদের দুয়ে তোমাদের পয়সা নিয়ে পড়াশোনা করেছে, নিজের আখের গুছিয়ে নিয়েছে। এরপর তোমাদের সফ্ট কর্নারের সুযোগ নিয়ে কোনদিন তোমার মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে তোমাদের সম্পত্তির দিকেও হাত বাড়াবে। আর তোমরাও ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে আজকে যেমন ওর পাশে খেতে বসার জন্য আমাকে জোর করছ, সেদিন ওর সঙ্গে এক বিছানায় শোবার জন্যও আমাকে জোর করবে।

ত্রিশ বছর আগের মায়ের হাতের সপাটে থাপ্পড়টা মনে পড়তেই কেঁপে ওঠে শ্রমণা। তথাগতর হাতদুটো চেপে ধরে পাশের চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ে। মধ্যবয়সী শ্রমনার চোখে আজ আর সেইদিনের ঔদ্ধত্য নেই। চাহনির সেই রোষাগ্নি নিভে গেছে। দীঘল চোখের কোণায় কোনায় টলমল করছে ক্ষমাকাঙ্খী স্বচ্ছ অশ্রুজল। তথাগতর প্রাজ্ঞ মুখে স্মিত হাসি আশ্বাস দিতে চায় শ্রমনাকে। তীব্র অনুতাপে দগ্ধ শ্রমণা চোখ নামিয়ে নেয়। তথাগত দেখতে পায় ওর দুচোখ বেয়ে অনবরত গলে নেমে আসছে রাগ, ঘৃণা, হিংসা, ক্ষোভ, বৈষম্য। নামগোত্রহীন সম্পর্করা বোধহয় এমন কোনো লগ্নেই জন্ম নেয়।

সমাপ্ত

কপিরাইট: পল্লবী পাল

প্রথম প্রকাশ : মাতৃশক্তি পূজাবার্ষিকী, ১৪২৮

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top