পাতালপুরীর রানীর আখ্যান

পাতালপুরীর রানীর আখ্যান

প্রবল শক্তিশালী দেবতা জিউসের নেতৃত্বে টাইটানদের সঙ্গে ভয়ঙ্কর যুদ্ধে জয়লাভ করেছে দেবদেবীর বাহিনী। যুদ্ধের রেশ স্তিমিত হতেই জিউস মান্যতা পেলেন স্বর্গের রাজা হিসাবে। অলিম্পিয়ান দেবতাদের প্রধান জিউস, শক্তিশালী বলিষ্ঠ চেহারা, হাতে তার শোভা পায় বজ্র, যার এক আঘাত নিশ্চিত মৃত্যুর বার্তা বহন করে। ভ্রাতা পসাইডন তার শক্তিশালী ত্রিশূল নিয়ে স্থান নিলেন সমুদ্র গর্ভে, প্রবল জলরাশির অসীম শক্তির অধিকারী হয়ে উঠলেন সমুদ্র সম্রাট পসাইডন। কনিষ্ঠ ভ্রাতা হেডিস সামান্য ব্যতিক্রম, অন্ধকার রাজ্যের প্রতি তার অমোঘ আকর্ষণ। মৃত আত্মাদের অধীশ্বর হয়ে তিনি আধিপত্য বিস্তার করলেন পাতালপুরীতে। রহস্যময় অন্ধকার জগতে তার একমাত্র সঙ্গী পোষ্য সারবেরাস। পাতালপুরীর মৃতদের অন্ধকার ছায়ায় একাকী নিঃসঙ্গ জীবনে অভ্যস্ত মধ্যবয়স্ক হেডিস, কিছুটা রূঢ়, নির্মম, আত্মসমাহিত। পাতালপুরীতেই ভাস্কর্য নির্মাণে তার সময় অতিবাহিত হয়, আপাত রুক্ষ হেডিসের সৃষ্টিশীলতা ফুটে ওঠে। ভ্রাতাদের সঙ্গে যোগাযোগও প্রয়োজন অনুসারেই হয়, নিজেও বিশেষ আগ্রহ দেখান না স্বর্গ বা মর্ত্য ভ্রমণে। ভ্রাতা জিউসের বহুনারীতে আসক্তির কথা জানেন না এমন দেব দেবীর অলিম্পাসে অস্তিত্ব নেই। পসাইডন ও ব্যতিক্রম নয়। ইন্দ্রিয় সুখের প্রয়োজন হলে হেডিস নিজেও ভ্রাতাদের পথ অনুসরণ করবে বৈকি।

ত্রিলোকের অধিকার দখলের পর বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হয়েছে। জিউস এবং প্রকৃতির দেবী দিমিতারের প্রেম জন্ম দিয়েছে এক নতুন দেবকন্যার। মাতা দিমিতার তার আদরের এই কন্যার নাম রাখলেন পার্সিফোনি, যার অর্থ ‘ কুমারী’। প্রকৃতির ভালোবাসা নিয়ে বেড়ে উঠতে উঠতে পার্সিফোনি হয়ে উঠলেন সুফলা বসন্তের দেবী। অপরূপ সুন্দরী সে, সিন্গ্ধ, কোমল। তার দৃষ্টির সারল্য যেন প্রস্তর হৃদয়কেও বিগলিত করতে সক্ষম। পার্সিফোনির নরম পেলব বাহু ছুঁয়ে যেন বাতাস নিজেই শিহরিত হয়ে ওঠে, তার অঙ্গুলির ছোঁয়ায় হেসে ওঠে ফুলের দল, তার চরণ স্পর্শে উর্বরা হয়ে ওঠে বন্ধ্যা ভূমি। মাতা দিমিতারের নয়নের মনি, হৃদয়ের টুকরো তার কন্যা পার্সিফোনি। কন্যা নবযৌবনা হলে মাতৃহৃদয় সদাই ত্রস্ত থাকে, সাবধানী হয়। পার্সিফোনিকে সমস্ত বিপদ থেকে রক্ষা করতে অঙ্গীকারবদ্ধ রক্ষণশীল দিমিতার, সেই হেতু কন্যাকে সর্বদা পুরুষ সঙ্গ থেকে বিরত রাখেন।

পার্সিফোনির দিন অতিবাহিত হয় প্রকৃতির সঙ্গে একান্তে সময় কাটিয়ে অথবা তার সখীদের সঙ্গে ক্রীড়ায়। নদীর দেবতা আকলুইসের তিন সুন্দরী কন্যা সাইরেনদের সঙ্গে বেশ সখ্যতা পার্সিফোনির। ওদের জলকেলি দেখে আনন্দিত হয় পার্সিফোনি, ওদের সুরেলা কণ্ঠের মাধুর্যে মুগ্ধ হয়। দেবী দিমিতারও অন্তরে স্বস্তি হয়, পার্সিফোনিকে নজরে রাখে সাইরেনরা। ধরিত্রীকে উর্বর রাখার দায়িত্বে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন দেবী দিমিতার। সাইরেনদের নির্দেশ দিয়ে গেলেন তার কন্যার খেয়াল রাখতে।

একদিন মনের খেয়ালে মর্তে প্রাতভ্রমণে এলেন হেডিস। পাতালপুরীর অধীশ্বর হেডিস অরণ্যে ভ্রমণকালে দেখতে পেলেন অপরূপা কন্যাকে। আপন মনে সে পুষ্পচয়ন করছে, আপন অঞ্চলে সংগৃহীত রংবেরঙের সুন্দর ফুলগুলিকে স্থান দিচ্ছে তার কেশরাশিতে। কি অপরূপ সিন্গ্ধতা তার মায়াময় মুখমণ্ডলে ! হেডিসের উৎসুক দৃষ্টি একে একে নিরীক্ষণ করল তার সুন্দর নয়নদ্বয়, উন্নত নাসা, রক্তিম ওষ্ঠ, নিটোল বক্ষ, সরু কটিদেশ, গভীর নাভি। তার কোমল তনু যেন ফুলের পাপড়ির চেয়েও পেলব। শুভ্র স্বচ্ছ বসনের আড়ালে বিদ্রোহ ঘোষণা করছে তার উত্থিত যৌবন। মৃত্যুপুরীর সম্রাট হেডিসের হৃদয়ের কাঠিন্যকে এক মুহূর্তে নরম করে দিল পার্সিফোনির যৌবন, সৌন্দর্য এবং সিন্গ্ধতা। পার্সিফোনির প্রতি এক তীব্র আকর্ষণ অনুভব করলেন হেডিস, মুগ্ধদৃষ্টিতে সম্মোহিতের মতো নিরীক্ষণ করতে লাগলেন পার্সিফোনিকে।

পাতাললোকে প্রত্যাবর্তন করেও হেডিসের মনে ক্ষনে ক্ষনে উদ্ভাসিত হতে লাগলো সে দৃশ্য, চোখের সামনে ভেসে উঠলো সেই সরলতাপূর্ণ দৃষ্টি সেই স্নিগ্ধ মুখমন্ডল। অস্থির হয়ে উঠলো তার হৃদয়, হেডিস মনে মনে স্থির করলেন তিনি বিবাহ করবেন এই কন্যাকে, পাতালোকের এই নিঃসঙ্গতা দূর করতে এই নারীর সাহচর্য তার একান্ত প্রয়োজন। সন্ধান করে জানতে পারলেন পার্সিফোনি তার ভ্রাতা জিউস ও দিমিতারের কন্যা। ভ্রাতা জিউসকে নিয়ে বিশেষ চিন্তার কিছু নেই তা হেডিস ভালো করেই জানেন, এ বিষয়ে দেবী দিমিতারের সঙ্গে কথোপকথনের প্রয়োজন ।

হেডিস সাক্ষাৎ করলেন দিমিতারের সঙ্গে,

—দেবী দিমিতার…সব সংবাদ কুশল তো ?

—পাতাললোকের দেব হেডিস… মর্তলোকে ? আমার কুশল সংবাদে যে আপনি আগ্রহী নন তা আমি ভালো করেই জানি, আমার সঙ্গে আপনার কী প্রয়োজন ?

—আপনার কাছে আমার একটি প্রস্তাব আছে ।

—প্রস্তাব ? বলুন।

—আপনার কন্যা পার্সিফোনিকে প্রত্যক্ষ করা মাত্রই আমার হৃদয়ে এক বিচিত্র অনুভূতির অস্তিত্ব অনুভব করছি, বড়োই সুন্দর কোমল প্রেমময় অনুভূতি। আমি পার্সিফোনিকে বিবাহ করতে ইচ্ছুক, তাকে পাতাললোকের রানীর মর্যাদায় ভূষিত করতে চাই। ভ্রাতা জিউস অসম্মত হবেন না, আপনি এই প্রস্তাব গ্রহণ করুন।

হেডিসের প্রস্তাব শোনা মাত্রই দিমিতার ভীষণ ক্রোধান্বিত হলেন এবং হেডিসকে বললেন

—আপন ইচ্ছাকে লাগাম দিন পাতালেশ্বর, এ অসম্ভব ! আপনার মতো একজন মধ্যবয়স্ক রূঢ় প্রস্তরহৃদয় পুরুষের সঙ্গে আমি কোনোমতেই আমার কন্যার বিবাহ দেব না। আপনি কি করে ভাবলেন যে আমি আমার প্রাণের চেয়ে প্রিয় কন্যা পার্সিফোনির জীবন চিরকালের মতো অন্ধকার পাতালপুরীতে নির্বাসন দেব। আপনি ভুলে যান, এই বিবাহের সামান্যতম সম্ভাবনাও নেই।

দিমিতারের কথায় হেডিস আঘাত পেলেন হৃদয়ে কিন্তু মনস্থির করলেন যেন তেন প্রকারেন পার্সিফোনি কে তিনি অধিকার করবেনই। হেডিস উত্তর দিলেন

—বেশ, তবে আমার সুপ্ত ইচ্ছা আমি নিজ মনেই লালন করি।

দিমিতার বুঝতে পারলেন না হেডিসের ইঙ্গিত, ভাবলেন হেডিস মত পরিবর্তন করেছেন। তবে নিশ্চিন্ত হতেও পারলেন না, তিনি তো জানেন তার প্রেমিক জিউস ও তার ভ্রাতাদের স্বভাব। তাই সাইরেনদের বারংবার সাবধান করেন পার্সিফোনিকে সুরক্ষিত রাখার জন্য।

প্রতিদিনের ন্যায় পার্সিফোনি সমুদ্র সংলগ্ন উপত্যকায় তার সখী সাইরেন ও বনপরীদের সঙ্গে খেলায় মগ্ন ছিল। ফুল বড়োই প্রিয় পার্সিফোনির, তার কেশরাশিতে নিত্য শোভা পায় রংবাহারি ফুল। খেলার মাঝেই রোজ সে আনমনে বনের ভিতর প্রবেশ করে পুষ্পচয়ন করে। হেডিস সে কথা জানতেন, তাই আড়াল থেকে এক ভীষণ সুন্দর ফুল নার্সিসাসটিকে মন্ত্র দ্বারা পার্সিফোনির থেকে অদূরেই রেখে দেন। নার্সিসাসের সুগন্ধ মাদকের ন্যায় আসক্ত করতে সক্ষম। কিছু সময়ের মধ্যেই পার্সিফোনির গোচরে আসে এই সুন্দর ফুলটি, কোমল ধীর পায়ে এগিয়ে তিনি নিচু হয়ে স্পর্শ করলেন ফুলটিকে। অজান্তে যে হেডিসের ফাঁদে সে পা দিয়েছে তা বিন্দুমাত্র অনুধাবন করতে পারেনি।

পার্সিফোনির পদতলের ভূমি হঠাৎ দুখন্ডে বিভক্ত হয়ে গেল এবং কৃষ্ণবর্ণের অশ্বশোভিত রথের রাশ টেনে ধরে পাতালগর্ভ থেকে উঠে এলেন মৃত্যুপুরীর সম্রাট হেডিস। বজ্র মুষ্ঠিতে চেপে ধরলেন পার্সিফোনির কোমল বাহু, বলপূর্বক টেনে তুললেন নিজ রথে। পার্সিফোনির হাত থেকে ভূমিতে পতিত হল নার্সিসাস। আতঙ্কিত পার্সিফোনি সাহায্যের জন্য প্রানপনে চিৎকার করলো, পার্সিফোনির আর্ত চিৎকারে ছুটে এলেন সাইরেনরা। কিন্তু হায় ! তাদের বিন্দুমাত্র সুযোগ না দিয়েই হেডিসের রথ পাতাল রাজ্যে প্রবেশ করলো, পুনরায় যুক্ত হয়ে গেল ভূমিখণ্ড, বন্ধ হয়ে গেল প্রবেশপথ ।

ঘটনার দ্রুততা ও আকস্মিকতায় দিশেহারা হয়ে গেল সাইরেন কন্যারা। পার্সিফোনির চিৎকার শুনেছিলেন পার্সিফোনির পিতা জিউস, সূর্যদেব হেলিওস। আকাশে বিরাজমান থেকে এই অপহরণের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন দেবতা হেলিওস। স্বর্গের প্রধান দেব জিউস তার ভ্রাতার সঙ্গে বিবাদে লিপ্ত হতে চাননি তাই পুরো বিষয়টি সম্পর্কে নীরব থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন । হেলিওসও বুদ্ধিমান, এই বিষয়ে না জড়ানোই শ্রেয় মনে করলেন।

পার্সিফোনির অপহরণ ও নিরুদ্দেশ হবার সংবাদ পেলেন দেবী দিমিতার। পার্সিফোনির অপহরণ প্রতিহত করতে না পারার জন্য সাইরেন কন্যাদের ওপর ভীষণ ভাবে ক্রুদ্ধ হলেন। সাইরেন কন্যাদের অভিশাপ দিয়ে বানিয়ে দিলেন অর্ধ মানবী অর্ধ পক্ষী, সুরমায়াবিনী সাইরেনদের দেহের রূপান্তর ঘটল পক্ষীমানবীতে।

ভগ্ন মাতৃহৃদয় নিয়ে দিমিতার দিশেহারা হয়ে প্রায় উন্মাদের মতো তার প্রিয় কন্যাকে সন্ধান করতে লাগলেন। দেবীর দুঃখে প্রকৃতির সৌন্দর্য ও উর্বরতা হ্রাস পেতে শুরু করল। পার্সিফোনির অস্তিত্ব যেন পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। বহু সন্ধান করেও যখন ব্যর্থ হলেন দিমিতার, ক্রন্দনরত অবস্থায় সাক্ষাৎ করলেন প্রসবের দেবী হেকেটির সঙ্গে। দিমিতারকে দেখে ভীষণ দুঃখ পেলেন হেকেটি , দিমিতারকে তিনি পরামর্শ দিলেন সূর্য দেবতা হেলিওসের সাহায্য নেওয়ার, কারণ তিনি সারা দিবসব্যাপী গগনে বিরাজমান থাকেন, তিনি নিশ্চয়ই কিছু প্রত্যক্ষ করে থাকবেন। দিমিতার সাহায্য প্রার্থী হলেন হেলিওসের

—হে সূর্যদেব..আপনি অসীম শক্তির অধিকারী। আপনি অম্বরে বিরাজমান থাকাকালীন পৃথিবীর কোনো ঘটনাই আপনার অগোচরে যাওয়া অসম্ভব। আমার প্রাণের চেয়ে প্রিয় কন্যা পার্সিফোনি কোনো দুষ্ট দ্বারা অপহৃত হয়েছে, তার দুর্দশার কল্পনাতেও আমি শিহরিত হয়ে উঠছি । মাতৃ হৃদয়ের আর্তি শুনুন দেব, বলুন কে সেই দুষ্ট অপহরণকারী।

দিমিতারের সন্তান হারানোর কষ্ট অন্তর থেকে ব্যথিত করল হেলিওসকে, তিনি দিমিতারের কাছে প্রকাশ করলেন

—আমাকে ক্ষমা করবেন দেবী, আমি অন্তর্কলহের অনুমান করে এই বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়াই শ্রেয় বলে অনুমান করেছিলাম। আপনার নিষ্পাপ কন্যা পার্সিফোনিকে বলপূর্বক হরণ করেছেন জিউসের ভ্রাতা মৃত্যুর দেবতা হেডিস, আমি অত্যন্ত দুঃখিত যে আমিও এই নির্মম ঘটনার সাক্ষী।

—কি আস্পর্ধা ! এ সমস্ত কিছু হেডিসের নীচ কর্ম? দুরাচারী বর্বর… আমি এখুনি যাব জিউসের কাছে, তাকে এই অন্যায়ের বিহিত করতেই হবে। আমার পার্সিফোনি না জানি কোন নরক যন্ত্রনা ভোগ করছে..

—দেবী … অপরাধ নেবেন না। আপনার প্রেমিক এবং অপহরণকারীর ভ্রাতা জিউস জানেন হেডিস পার্সিফোনিকে পাতালপুরীতে নিয়ে গেছেন। তার প্রচ্ছন্ন মদত ছিল এই কার্যে

— কি? এ আমি কি শুনলাম। সূর্যদেব বলুন একথা অসত্য। আপন কন্যার সর্বনাশ দেখেও নীরব থাকেন যে পিতা শত ঘৃণা গ্রাস করুক তাকে, পিতার নামে কলঙ্ক তিনি, পিতৃত্ব লজ্জিত তার এই কার্যে

শুনে প্রচন্ড ক্রোধে ও দুঃখে ফুঁসতে লাগলেন দেবী। হেলিওস দিমিতারকে আস্বস্ত করার চেষ্টা করলেন

—হে দেবী। ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক তবে এ কথা সত্য পার্সিফোনিকে দেবতা হেডিস অত্যন্ত ভালোবাসেন। হেডিসের প্রেম পার্সিফোনিকে পাতালপুরীতেও সুখেই রাখবে। আপনি এ বিবাহে সম্মতি দিয়ে হেডিসকে পার্সিফোনির স্বামীরূপে স্বীকার করেনিন

—অসম্ভব … এ অসম্ভব, আমি কাউকে ক্ষমা করবো না, পাতাললোকে গিয়ে আমার কন্যাকে আমি নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্ত করবোই, নাহলে আমার হস্তে প্রকৃতির ধ্বংস কেউ রোধ করতে পারবেন না।

ক্রূদ্ধ দিমিতার ছুটে গেলেন স্বর্গলোকে জিউসের কাছে। ভৎসনা করলেন জিউসকে এবং পণ করলেন যতদিন পর্যন্ত পার্সিফোনির মর্তলোকে আগমন হচ্ছে তিনি কেড়ে নেবেন পৃথিবীর উর্বরতা, বন্ধ্যা হবে সকল সুফলা ভূমি, হরিৎ চারণভূমি লোপ পাবে, সবুজ বনানী পরিণত হবে শুস্ক বৃক্ষে।

দেবীর ক্রোধে পৃথিবীর বুকে নেমে এলো খরা, দুর্ভিক্ষ। খাদ্যাভাবে প্রাণ হারালো বহু প্রাণী। বৃক্ষপল্লব শুস্ক হয়ে ঝরে পড়লো, সবুজ বনানী পরিণত হল মৃত কাষ্ঠে। জিউস প্রমাদ গুনলেন, বাধ্য হলেন দিমিতারের প্রতিজ্ঞার কাছে মাথা নত করতে। দেবতা হার্মিসের দ্বারা বার্তা প্রেরণ করলেন পাতালপুরীতে ভ্রাতা হেডিসের কাছে।

পাতালজীবন পার্সিফোনির কাছে প্রথমদিকে দুঃস্বপ্নময় ছিল। দাম্পত্য ধর্ষণের শিকার হয়েছেন পার্সিফোনি। সময়ের সঙ্গে হেডিসের হৃদয়ে ভীষণ পরিবর্তন ঘটল। হেডিসের সাহচর্যে ও আদর যত্নে ধীরে ধীরে পাতালজীবনে কিছুটা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন পার্সিফোনি, একইসঙ্গে মুগ্ধ হয়েছিলেন হেডিসের সৃষ্টিশীলতায়। তার প্রতি হেডিসের নিখাদ ও অসীম ভালোবাসায় পার্সিফোনির মনও হার মানল। পার্সিফোনি ভালোবেসে ফেললেন পাতাল রাজ্ হেডিসকে। স্বেচ্ছায় স্বীকার করলেন পাতালপুরীর রানীর শিরোপা। মৃত আত্মাদের সুখ দুঃখ,আশীর্বাদ অভিশাপ হেডিসের কাছে বয়ে নিয়ে আসতেন পার্সিফোনি। সুখেই দিন অতিবাহিত করছিলেন দুজনে।

ইতিমধ্যে হার্মিসের থেকে ভ্রাতা জিউসের বার্তা পেলেন, জিউসের আদেশে পার্সিফোনিকে ফিরে যেতে হবে তার মাতার কাছে। হেডিস পুনরায় নিঃসঙ্গ জীবনের কল্পনায় ভীষণ ব্যথিত হলেন, প্রেমিকা পার্সিফোনিকে হয়তো তার মাতা আর কোনো দিনই প্রত্যাবর্তন করতে দেবেননা পাতাললোকে। হেডিস পার্সিফোনির হাতে তার ভালোবাসার চিহ্নস্বরূপ তুলে দিলেন একটি বেদানা। গ্রিক পুরাণে কথিত আছে প্রেমিক বা প্রেমিকাকে বেদানা দিয়ে বিদায় জানালে সে পুনরায় ফিরে আসে ভালোবাসার মানুষের কাছে। পার্সিফোনি রওনা দিল মর্ত্যলোকের উদ্দেশ্যে। হেডিস তার প্রেমিকাকে জানালো সে প্রতীক্ষা করবে, পার্সিফোনি যেন ফিরে আসে তার কাছে।

পার্সিফোনিকে ফিরে পেয়ে যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেলেন দিমিতার, সহস্র চুম্বনে ভরিয়ে দিলেন কন্যাকে। দিমিতারের ক্রোধ প্রশমিত হল, প্রকৃতিতেও লাগল নতুন প্রাণের ছোঁয়া, বসন্ত দেবী মর্তলোকে ফিরেছেন। কিশলয় হাসতে লাগলো শুস্ক বৃক্ষের ডালে, ভূপতিত শুস্ক ফলগুলির বীজ থেকে অঙ্কুরোদ্গম হল, মাথা তুলে দাঁড়ালো শিশু উদ্ভিদ, ধীরে ধীরে পৃথিবী ফিরে এলো তার সতেজ সবুজ রং, রঙিন ফুলের বাহারে পৃথিবী হয়ে উঠল নয়নাভিরাম।

মাতার সঙ্গে পুনর্মিলনে আনন্দিত হলেও পার্সিফোনি ভুলতে পারলেন না পাতালবাসী তার স্বামী হেডিস ও তার ভালোবাসাকে। মর্তের নিঃসঙ্গ রাতগুলির তাকে বিনিদ্র রাখত, নরম শয্যায় হাত বুলিয়ে অনুভব করতেন এই শুন্যতা। বিরহকাতর হেডিসের নিঃসঙ্গ জীবন অনুভব করার চেষ্টা করতে চাইতেন। ক্রমেই উদাসীন ও অস্থির হয়ে পড়লেন পার্সিফোনি, উদগ্রীব হলেন হেডিসের কাছে পাতাললোকে ফিরে যাবার জন্য। মাতা দিমিতারকে নিজের হৃদয়ের ব্যথা জানাবেন বলে মনস্থির করলেন,

—হে মাতা… আপনার স্নেহ ও মমতায় সিক্ত হয়ে আমার জীবন ধন্য, কিন্তু মাতা আমার মন যে বড়োই ব্যাকুল, অসুখী।

—তোমার কি কোনোরূপ অযত্ন হয়েছে ? আমাকে বলো, আমি এখুনি সেবিকাদের আদেশ দেব।

—না মাতা, তা নয়। আমি পাতাল লোকে প্রত্যাবর্তন করতে চাই, আমার স্বামীর কাছে, তার ভালোবাসা আমাকে কাঙাল করেছে, আমার অন্তরকে শুন্য করে দিয়েছে। মাতা… আমি সশরীরে এখানে উপস্থিত কিন্তু আমার মন সর্বদা তার চিন্তায় উদাসীন ।

—পার্সিফোনি… ! ওই দুষ্ট নিশ্চয়ই তোমার ওপর কোনোরূপ জাদু করেছে, নাহলে এরূপ সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ছেড়ে পাতালপুরীর অন্ধকারে তুমি ফিরে যেতে চাও কোন মোহে ?

—মোহ নয় মাতা…প্রেম। ভালোবাসার মধ্যে সকল সুখ স্বাচ্ছন্দ্য পরিহার করে কষ্ট সহ্য করার শক্তি আছে।

—তুমি মোহে অন্ধ হয়ে গেছ পার্সিফোনি। যাও, ফিরে যাও নিজ কক্ষে।

পার্সিফোনি ভগ্ন হৃদয় নিয়ে ফিরে আসেন নিজের কক্ষে। ওদিকে বিরহকাতর হেডিস তার ভ্রাতাকে অনুরোধ করে যেন পার্সিফোনিকে ফিরিয়ে দেয়া হয় তার কাছে। কন্যার উদাসীন অবস্থা সম্পূর্ণ রূপে উপেক্ষা করতে পারেননা দেবী দিমিতার। অবশেষে এক মধ্যস্থতায় স্থির হয় সমগ্র বৎসরের কিছু সময় পার্সিফোনি থাকবেন পাতালপুরীতে এবং কিছু সময় থাকবেন তার মাতার কাছে। এই মধ্যস্থতায় অসন্তুষ্ট দিমিতার শর্ত দিলেন বৎসরের যতদিন পার্সিফোনি পাতালপুরীতে থাকবে, পৃথিবী বঞ্চিত হবে তার কৃপা থেকে, কোনোরূপ ফসল উৎপাদন হবেনা বৎসরের ওই নির্দিষ্ট সময়ে।

সময়ের ব্যবধানে হলেও পার্সিফোনি প্রত্যাবর্তন করলেন পাতালপুরীতে তার স্বামীর কাছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর হেডিস ফিরে পেলেন তার ভালোবাসাকে। দুই হৃদয়ের মিলনে অন্ধকারময় মৃত্যুপুরীতেও জয়ী হল অবিনশ্বর ভালোবাসা।

গ্রিক পুরাণে পার্সিফোনির এই কাহিনী দিয়েই পৃথিবীর ঋতুচক্রের ব্যাখ্যা দেয়া হয়। বৎসরের যে সময় পার্সিফোনি দেবী দিমিতারের কাছে থাকেন পৃথিবীতে গ্রীষ্ম ও বসন্ত বিরাজ করে, প্রকৃতি হয়ে ওঠে সুজলা,সুফলা। পার্সিফোনির পাতাললোকে ফিরে যাবার সঙ্গে সঙ্গে হ্রাস পেতে থাকে পৃথিবীর উষ্ণতা। দেবী দিমিতারের কন্যা বিরহের দুঃখে পৃথিবীতে নেমে আসে পাতা ঝরার মরশুম ও শীত।

প্রাচীন গ্রিক পুরাণের প্রতিটি কাহিনীর পরতে পরতে মিশে আছে বিবিধ কল্পছবি ও রোমাঞ্চ। কল্পিত মিথের সঙ্গে এক নিবিড় যোগসূত্র আছে বাস্তবের এবং এই কারণেই গ্রিক পুরান হয়ে উঠেছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

সমাপ্ত

তথ্যসূত্র :

গ্রীকমিথস, Edith Hamilton – মাইথলোজি

চিত্র ঋণ : ইন্টারনেট

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top