পিঠে খেলে মনে রয়

বাঙালির বারোমাসে তেরো পার্বণ আর তেরো পার্বণের মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় হল পৌষ পার্বণ৷ পৌষ সংক্রান্তির মনোরম শীতের সন্ধ্যা, মুখের সামনে থালায় ভরে সাজানো আছে হরেক রকমের সুস্বাদু পিঠে, গরম ধোঁয়া নেচে নেচে বেরিয়ে যাচ্ছে তার পিঠ থেকে, পাশে একবাটি টলটলে ঝোলা গুড়৷ আহা! নোলার দিব্যি খেয়ে বলুন তো ভোজন রসিক বাঙালি কি তাতে কামড় না দিয়ে মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারে ? পারেনা মশাই, স্রেফ পারেনা৷ আনুমানিক পাঁচশ’ বছর ধরে বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতিতে জনপ্রিয়তার শিখরে আছে পিঠে বা পিঠা৷ শুধুমাত্র বঙ্গদেশেই নয় ভারতীয় খাদ্যসংস্কৃতির ইতিহাসে বহু প্রাচীন কাল থেকেই পিঠে খাবার প্রচলন ছিল৷ মধ্যযুগের কাব্যগ্রন্থ ও রচনা সমূহের মধ্যে নানারূপে পিঠের উল্লেখ পাওয়া যায়৷

পিঠে ও পুলির পরিচয়

যে জিনিস খেতে ভালো তার নামে কিছু যায় আসে না৷ তবে নামের উৎপত্তির কথা যদি বলতেই হয় তাহলে ‘পিঠে’ বা ‘পিঠা’ শব্দের আগমন ঘটেছে সংস্কৃত শব্দ ‘পিষ্টক’ থেকে৷ সংস্কৃত সাহিত্যে ‘পিষ্টক’ শব্দটির উল্লেখ আছে৷ পিষ্ট শব্দের অর্থ দলিত বা মর্দিত বস্তু৷ তৎসম শব্দ ‘পিষ্টক’ সময়ের বিবর্তনে বাংলার ঘরে ঘরে এখন ‘পিঠে’ নামে পরিচিত৷ অপর দিকে ‘পুলি’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘পোলিকা’ থেকে যার অর্থ পুরু রুটি৷ পিঠের বিবরণ দিতে গিয়ে শ্রী হরিচরণ বন্দোপাধ্যায় বঙ্গীয় শব্দকোষ বইতে লিখেছেন, পিঠা হল চাল গুঁড়ো, ডাল বাটা, গুড়, নারিকেল প্রভৃতির সংমিশ্রণে তৈরি এক মিষ্টান্ন বিশেষ আর পুলি হল নারকেলের পুর দেওয়া খাদ্যবিশেষ৷

পিঠের প্রকারভেদ

যাই বলুন, মাত্র একটা পিঠে খেয়ে যেমন পেট ভরে না তেমনি মাত্র এক রকমের পিঠে খেয়েও মন ভরে না৷ পৌষ সংক্রান্তির দিন থেকে শুরু করে এক সপ্তাহ ধরে নানা রকমের পিঠে না খেলে পৌষ পার্বণের আনন্দ উপভোগ করা হল কই? বাংলার জনপ্রিয় পিঠেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – সেদ্ধ পিঠে বা ভাপা পিঠে, পুলি পিঠে, ভাজা পিঠে, দুধ পিঠে, নকশি পিঠে, চিতৈ পিঠে, রসের পিঠে ইত্যাদি৷ পিঠে তৈরির মূল উপাদান হল নতুন ধানের চালের গুঁড়ো ৷ চালের গুঁড়োর মন্ডকে বাটির আকার দিয়ে তাতে নারকেল, ক্ষীর, সন্দেশ, ডালসিদ্ধ, তরকারি বা অন্যান্য পুর দিয়ে হাতে নকশা করে অথবা ছাঁচে নকশা করে তৈরি করা হয় পুলিপিঠে৷ পুলি পিঠে সেদ্ধ করে অথবা তেলে ভেজেও খাওয়া হয়৷ ভাপা পিঠে দুধে বা চিনির রসে ভিজিয়ে বানানো হয় দুধ পুলি, রস পুলি৷ পিঠে খেতেও যেমন মিষ্টি তেমন মিষ্টি তার নামের বাহার – চন্দ্রপুলি, পূরণপুলি, ক্ষীরসাপটা, পাটি সাপটা, মুগ সাউলি ৷ বলতে গেলে ক্ষীরসাপটা, পাটিসাপটাও কিন্তু বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পুলিপিঠের দলেই পড়ে ৷ যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সাবেকি পাটিসাপটার পাশাপাশি এক্সপেরিমেন্টাল পাটিসাপটা তৈরী করতে গিয়ে মিষ্টিপ্রস্তুতকারীরা পিঠের কিছু আধুনিকীকরণ ঘটিয়েছেন, যেমন – আমন্ড পাটিসাপটা, বেকড পাটিসাপটা ইত্যাদি।

শীতের আমেজেই কেন পিঠে পার্বণ?

খাদ্য রসিকদের আবদারে যদিও মেলায় বা দোকানে মিষ্টি প্রস্তুতকারকরা সময়ে অসময়ে পিঠে বিক্রি করে থাকেন, তবে পৌষ সংক্রান্তিতেই বাংলার ঘরে ঘরে নিয়ম করে পিঠে বানানোর সময়৷ অগ্রহায়ণ মাসে গ্রামবাংলার ঘরে নতুন ধানের আগমন ঘটে৷ ধান রূপে ঘরে লক্ষীর আগমনে পৌষ সংক্রান্তিতে শুরু হয় নবান্ন উৎসব৷ নতুন ধান থেকে প্রাপ্ত চালের আর্দ্রতা ও সুগন্ধ পিঠে তৈরির মন্ড প্রস্তুত করার জন্য আদর্শ৷ চাল পুরোনো হতে থাকলে তার আর্দ্রতা আর সুগন্ধ কমতে থাকে৷ পুরোনো চালের গুড়ি থেকে তৈরী পিঠে আর সুস্বাদু থাকে না৷ তাই মাঘ ও ফাল্গুন মাসে শীতের আমেজ থাকতে থাকতেই পিঠের স্বাদ উপভোগ করা হয়৷

বঙ্গ সাহিত্যে পিঠের রমরমা

বৈদিক যুগেও নাকি পিঠে তৈরীর প্রচলন ছিল, তবে সে পিঠে তৈরী হত যব দিয়ে৷ যব দিয়ে তৈরী পিঠের নাম ছিল ‘পুরোডাশ’ যা দেবতাদের উৎসর্গ করার জন্য যজ্ঞে ব্যবহার করা হত৷ মহাভারতে ‘পুরোডাশ’ শব্দটির উল্লেখ আছে৷ বঙ্গ সাহিত্যের ইতিহাসের আনাচে কানাচে চোখ বোলালে অনায়াসেই পাওয়া যাবে পিঠের নাম ৷ কৃত্তিবাসী রামায়ণ থেকে আরম্ভ করে মধ্যযুগীয় মঙ্গলকাব্য যেমন অন্নদামঙ্গল, চন্ডীমঙ্গল, মনসামঙ্গল এ পিঠের উল্লেখ আছে৷ কৃত্তিবাসের রামায়ণে জনক ভূপতি কন্যার বিবাহ অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য আহারের আয়োজনে ‘পরমান্ন পিষ্টকাদি’র উল্লেখ আছে। বিজয়গুপ্ত রচিত মনসামঙ্গল কাব্যে পাওয়া যায় পিঠার নাম –

‘খির খিড়িয়া রান্ধে দুগ্ধের পঞ্চ পিঠা,
গুড় চিনি দিয়া রান্ধে খাইতে লাগে মিঠা৷’

মনসামঙ্গলকাব্যে বণিকসুন্দরীর রান্নার আয়োজনের বর্ণনা দিতে গিয়েও কবি লিখেছেন-

“মিষ্টান্ন অনেক রান্ধে নানাবিধ রস
দুই তিন প্রকারের পিষ্টক পায়স
দুগ্ধে পিঠা ভালো মতো রান্ধে ততক্ষণ
রন্ধন করিয়া হৈল হরষিত মন।”

কবিকঙ্কন মুকুন্দরামের চন্ডীমঙ্গল কাব্যে পিঠে বানানোর উল্লেখ পাওয়া যায় -‘নির্মান করিতে পিঠা বিশা দরে কিনে আটা, খন্ড কিনে বিশা সাত আট৷’ চন্ডীমঙ্গল কাব্যে খুল্লনা চণ্ডীদেবীর আশির্বাদ পেয়ে স্বামীর রসনাতৃপ্তির উদ্দেশ্যে সর্বমঙ্গলা স্মরণ করে পিঠে রান্না করেছিল,

“কলা বড়া মুগ সাউলি ক্ষীরমোন্না ক্ষীরপুলি,
নানা পিঠা রান্ধে অবশেষে।”

চৈতন্যচরিতামৃত কাব্যতে ‘পঞ্চাশ ব্যাঞ্জনে’র সঙ্গে ‘ক্ষীর পুলি নারিকেল পুলি আর পিষ্ট’ তৈরী হবার লেখা আছে ৷
“পঞ্চাশ ব্যঞ্জন অন্ন রাঁধিল কৌতুকে,
পিষ্টক পায়স অন্ন রান্ধিল একে একে।”

পিঠেপুলির প্রসঙ্গে কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তর ‘পৌষ পার্বণে’ কবিতার উল্লেখ না করলেই নয়। পিঠে পার্বণের আয়োজনের সরস বর্ণনা দিতে গিয়ে কবি লিখেছেন,

“আলু তিল গুড় ক্ষীর নারিকেল আর
গড়িতেছে পিঠেপুলি অশেষ প্রকার
বাড়ি বাড়ি নিমন্ত্রণ, কুটুমের মেলা
হায় হায় দেশাচার, ধন্য তোর খেলা।”

সময়ের সঙ্গে সুস্বাদু পিঠের জনপ্রিয়তা না কমলেও আগেকার গৃহিণীদের মতো পৌষ পার্বণের এলাহী আয়োজন এখন কমেই গেছে। ব্যস্ত জীবনের পাল্লায় পড়ে আগামীদিনে মকর সংক্রান্তিতে ঘরে ঘরে পিঠেপুলির দর্শন পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তবুও আশা করাই যায় পৌষ পার্বণের সুস্বাদু পিঠে ও নতুন গুড়ের সুবাস নিজগুণে মোহিত করে রাখবে বাংলার আগামী প্রজন্মকেও।

মকর সংক্রান্তির শুভেচ্ছা জানাই সকলকে ।

©পল্লবী

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top