
ভারতবর্ষের মাটিতে মুদ্রণযন্ত্র স্থাপন ও মুদ্রণশিল্পের সূচনা ছিল ধর্মীয় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। খ্রিস্টধর্মের প্রচারের উদ্দেশ্যে পর্তুগিজ মিশনারীরা ১৫৫৬ সালে গোয়াতে ভারতের প্রথম ছাপাখানা স্থাপন করলেও ভারতের পশ্চিম উপকূল থেকে পূর্বে পাড়ি দিয়ে মুদ্রণযন্ত্রের বঙ্গদেশে প্রতিষ্ঠা পেতে সময় লেগেছিল প্রায় ২২২ বছর। ১৭৭৮ সালে জন অ্যানড্রুজ সাহেব হুগলিতে সর্বপ্রথম ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যদিও তখন বাংলা হরফে মুদ্রণ ব্যবস্থার সূচনা হয়নি। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী শাসিত অখণ্ড ভারতের রাজধানীর শিরোপা তখন কলিকাতার মাথায়। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কার্য পরিচালনার জন্য খুব স্বাভাবিকভাবেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কর্মচারীদের আঞ্চলিক ভাষা শিক্ষা প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছিল। কোম্পানীর কর্মচারীরা যাতে সহজে বাংলা ভাষা শিখতে ও বুঝতে পারে সেই উদ্দেশ্যে বাংলা ভাষায় প্রথম ব্যাকরণ রচনা করলেন ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেড সাহেব। বইটির মুদ্রণের জন্য প্রয়োজন হল বাংলা হরফ নির্মাণের। এই কার্যে উদ্যোগী হলেন লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস এবং বইটির মুদ্রণের দায়িত্ব দিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাইটার চার্লস উইলকিন্সকে। লন্ডনে থাকাকালীন উইলকিন্স সাহেব চলনশীল ধাতব হরফ তৈরির কৌশল আয়ত্ত করেছিলেন। কিন্তু বাংলা হরফের জটিলতার কারণে উইলকিন্স সাহেব সুঠাম হরফ নির্মাণে সফলতা পাননি। উইলকিন্স সাহেবই খুঁজে আনলেন হুগলীর ত্রিবেণী নিবাসী বাঙালি ধাতুতক্ষণ শিল্পী পঞ্চানন কর্মকারকে। বংশপরম্পরায় তাঁদের কাজ ছিল অলঙ্করণ খোদাই, ধাতব অস্ত্রে নাম লেখা, নকশা আঁকা ইত্যাদি। উইলকিন্স সাহেবের তত্বাবধানে অক্লান্ত পরিশ্রম ও শিল্পনৈপুণ্যকে পাথেয় করে পঞ্চানন কর্মকার দলিল লেখক খুসমৎ মুন্সির মুক্তের মত হস্তাক্ষরের আদলে ছেনি কেটে ঢালাই করে তৈরি করলেন চলনশীল ধাতব বাংলা হরফ। এই হরফ ব্যবহার করে ১৭৭৮ সালে ‘অ্যানড্রুজ প্রেস’ থেকে মুদ্রিত হল ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেড রচিত ‘A Grammar of the Bengal Language’ ব্যাকরণ বই। বঙ্গদেশে সর্বপ্রথম মুভেবেল টাইপ বা বিচল বাংলা হরফের আত্মপ্রকাশ ঘটল “ বাংলার ক্যাসটন” পঞ্চানন কর্মকারের হাত ধরে। সূচনা হল বাংলা হরফে মুদ্রণ ব্যবস্থার।
১৮০০ সালের ১০ জানুয়ারি ‘শ্রীরামপুর ত্রয়ী’ অর্থাৎ উইলিয়াম কেরি, জশুয়া মার্শম্যান, উইলিয়াম ওয়ার্ড ও অন্যান্য মিশনারীদের উদ্যোগে ‘শ্রীরামপুর মিশন প্রেস’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কেরি সাহেবের উদ্যোগে এখানে কর্মচারী হিসেবে যোগদান করেছিলেন পঞ্চানন কর্মকার। তাঁর নিরলস চেষ্টায় অল্প দিনের মধ্যে সুঠাম ও সুন্দর বাংলা হরফ তৈরি হয়। ১৮০১ সালে এই ঐতিহাসিক প্রেস থেকে পঞ্চানন কর্মকারের তৈরি উত্কৃষ্ট বাংলা হরফে উইলিয়াম কেরি অনুদিত বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্ট প্রকাশ পেয়েছিল। বাংলা মুদ্রাক্ষরের জনক পঞ্চানন কর্মকার সৃষ্ট বাংলা হরফ মুদ্রণ শিল্পে দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত ছিল।
শ্রীরামপুর মিশন প্রেসের অপর একজন দক্ষ কম্পোজিটর ছিলেন গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য। পরবর্তীতে তিনি কলকাতায় স্বাধীনভাবে পুস্তক মুদ্রণ ও প্রকাশনার ব্যবসা শুরু করেন। ১৮১৬ সালে গঙ্গাকিশোর কলকাতার Ferris and Company Press থেকে বাংলা ভাষার প্রথম সচিত্র পুস্তক ‘অন্নদামঙ্গল’ প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে তিনি ‘চাণক্য শ্লোক’, ‘গঙ্গাভক্তিতরঙ্গিণী’, ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’ প্রভৃতি প্রকাশ করেন। ১৮১৮ সালে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য ও হরচন্দ্র রায় বাংলা ভাষায় পুস্তক প্রকাশের জন্য ‘বাঙ্গাল গেজেট প্রেস’ স্থাপন করলেন কলকাতার ১৪৫ নম্বর চোরবাগান স্ট্রিটে। সেই বছরেই মে মাসে বাংলা ভাষায় মুদ্রিত প্রথম সংবাদপত্র ‘বাঙ্গাল গেজেট’ প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটির বিক্রয় মূল্য ছিল এক টাকা এবং সডাক মূল্য ছিল দুই টাকা। পত্রিকাটি এক বছর চলার পর বন্ধ হয়ে যায়। যদিও অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন ১৮১৮ সালের ২৩শে মে শ্রীরামপুর মিশন থেকে প্রকাশিত জন ক্লার্ক মার্শম্যান সম্পাদিত ‘সমাচার দর্পণ’ বাংলা ভাষার প্রথম সাপ্তাহিক সংবাদপত্র। তবে, সমাচার দর্পণ পত্রিকার দুটি প্রতিবেদনে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যকে ‘বাঙ্গাল গেজেট’-এর প্রকাশক এবং সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করা আছে। বাংলার ইতিহাসে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য প্রথম বাঙালি প্রকাশক হিসাবেও আখ্যায়িত।
উনিশ শতকে অখণ্ড বঙ্গদেশে বাংলা হরফে মুদ্রণ ব্যবস্থা ও প্রকাশনা শিল্পের যে গৌরবময় সূচনা হয়েছিল, একবিংশ শতাব্দীতেও সে ধারাবাহিকতা অমলিন রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে সারাবছর ধরে বাংলাভাষায় বিপুল সংখ্যায় বই, পত্র-পত্রিকা, লিটল ম্যাগাজিন মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়৷ দুই বাংলার জনজীবন, অলি, গলি, রাজপথের সঙ্গে রয়েছে বাংলাভাষার গৌরবময় সহাবস্থান। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাংলাভাষায় মুদ্রিত বইয়ের সহায়তায় শিক্ষালাভ, গবেষণা কার্য সম্পাদন ও সাহিত্যচর্চা করে আসছেন অসংখ্য বাংলাভাষী মানুষ। আজও সারা পৃথিবীর বাঙালী হৃদয়ে হাত রেখে উদাত্ত কন্ঠে বলে ওঠেন, ‘মোদের গরব মোদের আশা, আ মরি বাংলাভাষা’।
© পল্লবী পাল

