বাংলাভাষা উচ্চারিত হলে গর্ব হয়

আজ মাতৃভাষা দিবস। আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙা একুশে ফেব্রুয়ারি। এই দিনের তাৎপর্য বা গুরুত্ব হয়ত অনেক বাঙালিই সঠিক ভাবে অনুধাবন করতে পারেননি বা করেননি বা করতে চাননি। বঙ্গ মায়ের নাকউঁচু ইঙ্গ বা হিঙ্গ সন্তানদের বাদ দিলে বাংলা ভাষাকে যারা মনে প্রানে ভালবাসি, বাংলা ভাষায় কথা বলে আরাম পাই, তাদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। অনেকের মতেই এখন বাংলা ভাষা বিপন্ন। আমি চিরকালই আশাবাদীদের দলে। আমার সত্যিই মনে হয় না এখনও সে দুর্দিন এসেছে বা ভবিষ্যতে কোনোদিনই আসবে। কীবোর্ডে বাংলা টাইপ করা কত ঝামেলার ব্যাপার, তাও কষ্ট করে করছি। আমার মতো অনেকেই করে, আলবাত করে। নিন্দুকেরা এসব আঁতলামি বলে,বলুক। আমি বলি ‘চেষ্টা, বন্ধু চেষ্টা।’  তা যে যাই বলুক, আমার মনে হয় ভালো বাংলা লেখা ও বলা দক্ষতার পরিচয়। নির্ভুল বানান ও সঠিক শব্দচয়ন ভাষা জ্ঞানের গভীরতার প্রতিফলক। ক’জন সেটা ঠিকঠাক পারে বলুন তো? আমারও ভুল হয়, তাই বলে ভুল সংশোধন করে শেখা থামিয়ে দিই না। কারণ আমি এই ভাষাকে ভালোবাসি। ‘নির্ভুল বাংলা লিখতে ও বলতে পারি।’ – এই কথাটা বলতেই বেশ একটা গর্ব লাগে তাই না? হ্যাঁ, সময়টা এমনই এসেছে, এখন ভালো বাংলা লেখা ও বলাটাই দক্ষতার পরিচয়। ইংরেজিতো এখন বাচ্চারাও ঝরঝরে বলে। সঠিক বাংলা বাক্য ক’জন বলতে পারবে? অনেক বাচ্চাতো বাংলা পড়তেই জানে না বা পড়তে গেলেই প্রতি শব্দে হোঁচট খায়, অদ্ভুত উচ্চারণ করে। সেটা কি বাবা মায়ের কাছে কোনোদিন গর্বের বিষয় হতে পারে? সত্যি বলছি, আমার নিজের লজ্জা লাগবে আমার মেয়ে যদি গড়গড়িয়ে আবোল তাবোল, সহজপাঠ, টুনটুনির গল্প পড়তে না পারে।

অনেকে আবার মুখ বেঁকিয়ে বলে বাংলা আজ নাকি তারাই বলে যারা লিঙ্গুয়া ফ্রানকায় দক্ষ নয়। কারোর কাছে আবার ও তো অশিক্ষিতের ভাষা – রিকশা, টোটো, অটো, বাসে চলে। ওলা, উবেরেতেও চলে না। (!) চোখ কান খোলা রাখলে আমি আবার উল্টোই শুনি। আগেই বলে রাখি, আমি জল খাই, হাওয়াও খাই কিন্তু বাবার প্রসাদ সেবন করি না। অফিসেই এক গুরুত্বপূর্ণ কথোপোকথনের পর ফোন কেটে দিয়ে পাশের কিউবিকলে বসা দলের সর্দার (পড়ুন টীম লিড ) বলল,”উফফ, বিষ মাল শু… বা.. একটা”, প্রথমে মনে হল ভুল শুনলাম। আরেকদিন অফিসের নীচে চা খেতে গিয়েও এরকম হল। কে যেন বলল, ”It’s so hot today”, আমি পরিষ্কার শুনলুম ”শালা! কি গরম রে ভাই !”  মশা কামড়ালে কে যে ন্যাকামি করে ‘ouch’ বলে কে জানে। আমি তো বলি, “বাপ্ রে ! জ্বালিয়ে খেলো।” কলকাতার সো কল্ড এলিট রেস্তোরাতে গিয়ে বাংলা বললে বেশ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় লোকে, আমার নিজেকে বেশ বিশিষ্ট ব্যক্তি মনে হয়। বাংলায় ঝগড়া করে, দরদাম করে, মায় খিস্তি দিয়ে যা সুখ না, আহা ! 

স্বীকার করছি, আমিও বাংরেজি বলে ফেলি মাঝে মাঝে, ওই দলে পড়ে। আসলে শহুরে হাওয়া লেগেছে তো তাই আরকি। আমার দোষ নেই, এখানে গোদা বাংলা অনেকে বোঝে না বা ভুল বোঝে। ভাষা প্রবহমান বলেই বাংলা ভাষাতে অনেক শব্দ বহিরাগত। তারমধ্যে আবার কথ্য একগাদা অপ্রয়োজনীয় ইংরেজি শব্দ ঢুকে তাল গোল পাকিয়েছে। যদি বলি ‘আজ বাড়ির আন্তর্জালটা (ইন্টারনেট) নিচে নেমে ছিল বা তারহীন বিশ্বস্ততা (WiFi) কাজ করছে না।’ শুনে লোকে ঘাবড়ে যাবে। ‘ও নমিতা দি ! ঘরে ঢুকেই হাত জীবাণুমুক্তিকরণ করবে; পেয়ালা পিরিচটা ঠিক করে মাজা হয়নি বা নাচট্চটে কড়াইটা খরখরে ঘষার নুটি দিয়ে পরিষ্কার কোরোনা, এই সব ক্ষেত্রে বাংরেজি না বলে পারা যায় বলুন তো? কথ্য ভাষায় কিছুটা মিশেল প্রয়োজন, তবে সেই মিশ্রনের অনুপাত বেশি হলে ভাষার মাধুর্য নষ্ট হতে বাধ্য।

প্রসঙ্গত, আমার মেয়েও ইংরেজি মাধ্যম এ পড়ে। তাই বলে কার ঘাড়ে কটা মাথা যে আমাকে বলে তোমার মেয়ের বাংলাটা ঠিক আসে না? সে আমার মতোই  বাংলা ভালবাসে। বাংলা, ইংরেজি দুটোতেই সাবলীল।ভাষা ভালবেসে শিখতে হয়, শেখাতেও হয়। আমি নিজে স্পোকেন ইংলিশ এর প্রশিক্ষণ দিই। শুধু মেয়েকে নয়, সব ছাত্র ছাত্রীদেরই একটাই জিনিস শুধু শেখাই – বেঙ্গলিটা বাংলায় ভেবে বল আর  ইংরেজিটা ইংলিশে। আর যেখানে যে ভাষায় কথা বলার প্রয়োজন নেই সেখানে সে ভাষা ব্যবহার করার কোনো দরকার নেই। জাহির করা কখনোই জ্ঞানের পরিচয় নয়। আমার মনে হয় বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘রয়্যাল বেঙ্গল ম্যানকাবদের’ এটা শেখাতে পারলেই বাংলাভাষার ‘হায় হায় ! গেল গেল!’ সমস্যার অনেকটা সমাধান করা সম্ভব। নয় কি ? 

পুনশ্চ: মাতৃভাষা দিবসের শুভেচ্ছা জানাই সবাইকে। আমার রক্তে বইছে বাংলাভাষা। ‘এ যে আমার মায়ের ভাষা, আশৈশবের ভালোবাসা।’ একুশে ফেব্রুয়ারির ভোর আর মাতৃভাষার জোর বঙ্গসন্তানের গর্ব হোক। আমি গর্বিত আমি বাংলায় লিখি, পড়ি, কথা বলি এবং চরম চটে গেলে চমৎকার বাংলায় চরম গালি দিই।

© পল্লবী পাল

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top