
অমনোনীত
এক নিতান্তই সাধারণ মধ্যবিত্ত রবিবার। রবিবার মানেই ঘড়ির কাঁটায় আটকে থাকা জীবন থেকে মুহূর্তের ফুরসত। মধ্যাহ্নভোজে মাংস ভাত না জুটলেও ছয় টাকা পিস দুটো ডিমের পুরু নরম অমলেট দিয়ে আজ মণিদীপা বর আর ছেলের মন ভুলিয়ে দিয়েছে। ভোজন পর্ব মিটিয়ে টেবিলে কোনোরকমে তেল চিটে ন্যাতা বুলিয়ে তাড়াতাড়ি শোবার ঘরে চলে আসে মনিদীপা। আপনি হয়তো ভাবছেন স্বামী সন্তান পাশে নিয়ে ভাত ঘুম দিতে পারলে, কিংবা ঘুমন্ত সন্তানকে পাশ ফিরিয়ে স্বামী সোহাগী হয়ে উঠলেই হয়তো মনিদীপার রবিবার সার্থক হবে। না, মনিদীপার গল্প একটু অন্য। আলসে দুপুরের নিদ্রা বিলাস সে এক বছর যাবত ত্যাগ করেছে। কারণ? একটি সাত হাজারী স্মার্টফোন। গেল বার পুজোর বোনাস পেতে কর্তা কিনে দিয়েছিল। সাত হাজারী স্মার্টফোন হলেও মনিদীপার কাছে ওটাই আহামরি। তাকে কভার পরিয়ে স্ক্রীনগার্ড লাগিয়ে বড় যত্নে রাখে। সাবধানী হাতে ব্যবহার করে। এক মুহূর্ত চোখের আড়াল করে না। কাউকে বেশিক্ষণ নিজের ফোন ঘাঁটতে দেয় না। তার পিছনেও অবশ্য একটা কারণ আছে। ব্যাস, আপনাদের মাথায় নিশ্চয়ই পরকীয়া ঘুরছে। নাহ রে বাবা, না। মনিদীপা একটি নিয়েই গলদ ঘর্ম, দুই নৌকায় পা দিয়ে চলার সাধ্যি নেই । সত্যি কথা বলতে ইদানিং তার এক অন্যরকম ভালোবাসা হয়েছে। এবার ঠিক ধরেছেন, টুকটাক লেখালেখি।
গেলবার পুজোর পর বিজয়া করেতে এসে ননদের ছেলে টুকাই মামীর ফেসবুক একাউন্ট খুলে দিয়েছিল । চেনা পরিচিত আত্মীয় স্বজনকে বন্ধুবৃত্তে সেই অনুরোধ সহকারে ডেকে এনেছিল। তারপর মনিদীপা বুঝেছিল ফেসবুক এক আশ্চর্য জাদুর জগত। মাস খানেক যেতে না যেতেই কি সুন্দর স্কুল কলেজের বন্ধুদের একে একে খুঁজে পেয়ে গেল সেখানে। কত নতুন গ্রুপের মেম্বার হল। ছেলের আবৃত্তি, ভালোমন্দ রান্না, তারপর বর আর ছেলেকে নিয়ে সুখী সংসারের ছবি পোস্ট করল। মুখোমুখি চেনা, স্বল্প চেনা থেকে শুরু করে এখন অচেনা মানুষও ফেসবুক সূত্রে ওর চেনা মানুষ হয়ে গেছে।
বই পড়া, গল্প কবিতা লেখা মনিদীপার কিশোরী বেলার শখ।কলেজে উঠে অবধি ডায়েরির পাতায় কলমের আঁচড় কাটার অভ্যাস টিকিয়ে রেখেছিল।সংসার হবার পর ওসব শখ সব অফিস টাইম, ফিডিং টাইম আর তিনবেলার হেঁসেলে হাঁড়ি কড়াই খুন্তি আর বেলন চাকির মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল। সংসার জিনিসটা ভারী আজব কারখানা। সেই কারখানায় যেদিকে যখন তাকাও কাজ। কাজ যেন মধুসূদন দাদার দইয়ের ভাঁড়। ফুরোতেই চায় না। একটা শেষ হলেই আরেকটা চোখে পড়ে। একটা মিটলেই আরেকটা মনে পড়ে। তো এই অফুরন্ত কাজের ফাঁকে নিজের জন্য একটু সময় ম্যানেজ করতে লোভ দেখিয়েছিল স্মার্টফোন।
হয় অর্পিতা নাহলে মৌমিতা, কোনো এক বন্ধু যেন নিজের লেখালেখির পেজ লাইক করার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল।ওদের মধ্যেই কেউ বিধিলিপি নামের সাহিত্য গ্রুপেও জয়েন করায়। ব্যাস, বই ছেড়ে তখন ফেসবুকেই গল্প পড়া শুরু। বাবা রে, কতজন কত কী লেখে। পরিত্যক্ত বাড়িতে অদ্ভুত দেখতে কেয়ারটেকার সহ ভূতের গল্প, পুলিশ মস্তান খুনোখুনি রক্তারক্তির গল্প, শাশুড়ি বউয়ের কোন্দলের গল্প, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীচেতনা জাগানোর গল্প, বুড়ো মা বাবাকে শিক্ষিত ছেলের বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসার গল্প, অন্যের বর আর অন্যের বউ মিলে বিছানায় মাখামাখি পরকীয়ার গল্প আরও কত কী। আর তাতে লাইক কমেন্টের বন্যা। কতবার কত গল্পের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করে ফেলেছে মনিদীপা। স্বামী,শ্বশুর-শাশুড়ি কিংবা সন্তানের অত্যাচারের গল্প শুনে ওর প্রতিবাদী মন বিপ্লব করতে চেয়েছে। কিন্তু পারেনি। আসলে ওর বরটা নিতান্তই গোবেচারা, ভালো মানুষ। শাশুড়ি স্বর্গগত আর ছেলেটা সবে ওয়ানে পড়ছে। কোনটাতেই খাপ খাওয়াতে পারছে না। ঠিক এই সময় মনিদীপার মাথায় এই লেখালেখির শখ চাপে। বাস্তবে ওর সুখের সংসার হলেও কল্পনায় একটা জাঁদরেল শাশুড়ি বা একজন অত্যাচারী বর তৈরি করাই যায়। নিষিদ্ধ প্রেমের আলতো ছোঁয়ায় শিহরণ জাগানো প্রাক্তন প্রেমিক আমদানি করাই যায়। ব্যাস, আর দেরি কীসের? এক কালে টুকটাক অভ্যাস ছিল বলে ‘তুমি ছাড়া কেউ বোঝেনি’ শীর্ষক একটা ছোট্ট আর সুন্দর গল্প লিখে ফেলে।
দুরু দুরু বুকে গল্পটা নিজের ওয়ালে পোস্ট করতেই চমত্কার হয়ে গেল। কতজন যে ওর লেখার প্রশংসা করল ভাবা যায় না। কমেন্ট বক্সে দারুন, অসাধারণ, অনবদ্য, কি সুন্দর লিখেছেন, চোখে জল চলে এল আরও কত সুন্দর সুন্দর কমেন্ট। সাহিত্য প্রেমী বন্ধুরা উত্সাহ দিল আরও লেখ। মনিদীপা সাহস করে বিভিন্ন সাহিত্য গ্রুপেও একই গল্প পোস্ট করে দিল, সেখানে প্রায় পাঁচ গুণ প্রতিক্রিয়া।প্রচুর মানুষ লিখেছে, আরও এরকম গল্প চাই, আরও পড়তে চাই। সেই যে উৎসাহ পেল মনিদীপা তখন থেকে ঠিক করল সংসার থেকে সময় চুরি করে ও গল্প লিখবে।দুপুরের ভাত ঘুমও সেই সময় থেকেই বিসর্জন দিল।তারপর একের পর এক জ্বালাময়ী প্লটের গল্প আর পাঠক পাঠিকার ভালোবাসা। সেই সব প্লটের বেশিরভাগই কিছুটা কল্পনা, কিছুটা সিরিয়াল, কিছুটা সিনেমা আর কিছুটা কাজের দিদির মুখের পরচর্চার নিপুন সংমিশ্রণ। মনিদীপার লেখার গুণে গল্পের গতি, বর্ণনা আর চরিত্র এতটাই জীবন্ত হয়ে উঠল যে পাঠক পাঠিকারা মুগ্ধ। মনিদীপার গল্প কোনো কোনো ইভেন্টে বিজয়ীর শিরোপা পেল। গোটা তিনেক গল্প কয়েকটি ম্যাগাজিনেও স্থান পেল। ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখে আর বহু মানুষের বাহবা পেয়ে মনিদীপার নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস আর কলমের প্রতি প্রাক্তন ভালোবাসা সুদৃঢ় হয়ে উঠল।সে এখন এক সৃষ্টিশীল মননের অধিকারিণী। সংসারের অসারত্ব তাকে বিশেষ স্পর্শ করে না। পাঠকের মনে আলোড়ন তোলা গল্পের সন্ধানে সে মগ্ন থাকে। পাঠকদের অনুরোধে খুব তাড়াতাড়ি নিজের লেখা একক বই প্রকাশ করার স্বপ্ন বোনে।
ঘরে এসে মনিদীপা দেখে নরম বিছানায় ছেলে আর বর আরাম করে ঘুমাচ্ছে। আজ সকালেই নিজের ফেসবুক দেওয়ালে একটা অণুগল্প পোস্ট করেছে। খাটের পাশে হেলান দিয়ে সেই পোস্টের কমেন্টগুলো পড়ে পাঠকদের ধন্যবাদ জানাচ্ছিল। অনুগল্পটি বারোশো মানুষ পছন্দ করেছেন আর একশ চুয়াল্লিশ জন মানুষ তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। এত কমেন্টের উত্তর দেয়া বেশ সময় সাধ্য ব্যাপার। “আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ”, এই কমেন্টাই সকলকে রিপ্লাইতে পেস্ট করে দিচ্ছিল। ঠিক সেই সময় মনিদীপার ইমেল আইডিতে টিং করে চিঠি আসার খবর এল।একটি সাহিত্য পত্রিকার থেকে মেল এসেছে।
মনিদীপা গত কয়েকমাস ধরে বেশ কয়েকটা নামকরা বাণিজ্যিক পত্র পত্রিকাতে নিজের সবচেয়ে পছন্দের বাছাই করা ভালো ভালো অপ্রকাশিত গল্প পাঠিয়েছিল। এতদিন একটাও মেলের উত্তর আসেনি। সাহিত্য জগতের বন্ধুরা অনেকেই বলেছিলেন উত্তর আসতে বেশ সময় লাগে।আজ প্রথম কোনো পত্রিকার থেকে উত্তর এসেছে। মনিদীপার চোখ চকচক করে উঠল। নিজের নাম এবার নামী পত্রিকার পাতায় ছাপার অক্ষরে দেখতে পাবে, লক্ষাধিক মানুষ ওর গল্প পড়বে, মতামত দেবে। রিমঝিম আনন্দে তাড়াতাড়ি ইমেলটা খুলতেই একটা বড়সড় ধাক্কা খেল মনিদীপা। ইমেলে লেখা আছে, “দুঃখিত! আপনার গল্পটি সম্পাদক মণ্ডলীর বিচারে অমনোনীত হয়েছে”। মনিদীপার বুকটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। অমনোনীত শব্দটা দর্শনেন্দ্রিয়র মাধ্যমে সোজা গিয়ে বিদ্ধ হল মগজে। ভারি যত্ন করে লিখেছিল গল্পটা। লেখিকা বন্ধুকে পড়িয়েছে। সেও বলেছিল “খুবই সুন্দর, পাঠিয়ে দাও। এ গল্প সম্পাদক ফেলতে পারবেন না।” তাহলে ? কী করে ওর এমন অসাধারণ সৃষ্টির কপালে এমন অনাসৃষ্টি কান্ড ঘটল?
মনিদীপার মনটা খুবই ভেঙে গেছে। সবেমাত্র প্রথম প্রত্যাখ্যানের চিঠি পেয়েছে। এমন নেতিবাচক উত্তর ও আশা করেনি। এখন ওর শোকের সময়। ওয়ার্ড ফাইলটি খুলে মনিদীপা আবার গল্পটা পড়ে। ওর মনে পড়ে যায় প্রায় একমাস ধরে দুপুরবেলা একটু একটু করে সময় বের করে এই গল্পটা লিখেছিল। চরিত্রদের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করে প্রতিটা সংলাপ ওদের মুখে বসিয়েছিল। ওয়ার্ড কাউন্ট বেশি হয়ে যাচ্ছিল বলে বাক্য বিন্যাসে রদবদল ঘটিয়ে লেখাটা বার দশেক পরিমার্জন করেছে। ওর বিচারে বিগত ছয় মাসে লেখা সব গল্পের মধ্যে এটা সবচেয়ে অভিনব প্লট। ত্রিকোণ সম্পর্কের টানাপোড়েন এত সুন্দর ভাবে ফুটিয়েছে, নিজেরই কি তৃপ্তি হচ্ছিল। প্রত্যাখ্যান পাওয়ার পরে এখন ওর মনে অদ্ভুত ব্যথা অনুভব হচ্ছে। যেন নিজের সন্তান ভালো স্কুলের প্রবেশিকা পরীক্ষায় ডাহা ফেল করে ঘরে ফিরেছে। কমেন্টের রিপ্লাই মাঝ পথে থামিয়ে ফোনটা পাশে রেখে বরের গা ঘেঁষে শুয়ে পড়ে মনিদীপা।আজ কেমন একটা আত্ম-সন্দেহ বোধ ওকে ঘিরে ধরছে। এত পাঠক পাঠিকার ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া শুধুমাত্র একটা শব্দের কাছে হেরে গেল। অমনোনীত।
মনিদীপা ভেবেছিল মনমরা ভাবটা কয়েকদিনের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু না। ও যতবারই লিখতে বসছে ততবার ঐ একটাই শব্দ ওর মাথায় নাগরদোলার মতো ঘুরপাক খাচ্ছে।প্রত্যাখ্যানের সাথে মোকাবিলা করা একজন লেখক লেখিকার পক্ষে বেশ কঠিন কাজ। হঠাৎ করেই যেন ও হীনমন্যতায় ভুগছে। মনের মধ্যে ভেসে ওঠা সব কল্পনা আর অনুভূতিকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে, কিছুই লিখতে ইচ্ছা করছে না। মনে হচ্ছে এতদিন হাজার হাজার মানুষ ওকে যা বলেছে, যতটা প্রশংসা করেছে, সবই কি তবে অসত্য? ওর মন রাখতে বলেছে? ওর লেখা গল্প যদি খারাপ হবে তাহলে কেউ কেন সমালোচনা করেনি এতদিন। তাছাড়া পত্রিকার তরফে ওকে জানায়নি যে কেন ওর লেখা প্রত্যাখ্যান করেছে। সেটা জানলেও নয় কিছু বুঝতে পারত।
বড় সমস্যায় পড়েছে মনিদীপা। দেখতে দেখতে প্রায় এক মাস কেটে গেছে। লেখা আসছে না। ঐ একটাই শব্দ মনিদীপাকে দিনে রাতে দুঃস্বপ্ন হয়ে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।অমনোনীত। অনেকেই মনিদীপার ইনবক্সে খোঁজ করছে, ও দিদি অনেকদিন লেখা পাচ্ছি না। কবে আবার আপনার গল্প পড়তে পারব? পরের গল্প কবে আসছে? দিদি এবারের সংখ্যায় আপনার গল্প দিচ্ছেন তো? মনিদীপার যেন দমবন্ধ পরিস্থিতি। লেখার আকাঙ্ক্ষা কিছুতেই পুনর্জীবিত হচ্ছে না। মনিদীপার এক সুলেখিকা বান্ধবীকে জিজ্ঞাসা করাতে সে বলল, এটাকে নাকি রাইটার্স ব্লক বলে। কোনো কারণে কল্পনার দ্বার অবরুদ্ধ হয়ে যায়, লেখা তার মধ্যে বন্দী হয়ে যায়। চিন্তার কোনো কারণ নেই। কিছু সময় পর ঠিক হয়ে যাবে। মনিদীপা বান্ধবীকে আসল কারণটা জানাতে পারেনি। অন্য কাউকেও মনের কথা খুলে বলতে পারছে না। হাজার হোক যৎসামান্য যা সুনাম হয়েছে সেখানে নিজমুখে সন্তানসম নিজসৃষ্টির প্রত্যাখানের খবর জানানো বেশ প্রেস্টিজের হাওয়া বেরিয়ে যাওয়া ব্যাপার।নিজের মনেই গুম হয়ে রয়েছে মনিদীপা।
প্রত্যাখ্যান জিনিসটা কিন্তু মোটেই সহজ নয়। যত সহজে প্রত্যাখান করা যায় , তত সহজে গ্রহণ করা যায় না। প্রত্যাখ্যান অনেকসময় প্রতিভার প্রতিচ্ছবি হিসাবে ভ্রম তৈরি করে । ফিরিয়ে দেওয়া লেখাটা নিয়ে কী করবে ভেবে পায় না মনিদীপা। নিজের ফেসবুকে পোস্ট করবে নাকি অন্য পত্রিকায় পাঠাবে? সেখানেও যদি ফিরিয়ে দেয়। অন্য লেখাগুলোর মতো যদি এই লেখাতে লাইক কমেন্ট না আসে তাহলে কী হবে ? কি কুক্ষণে একদিন সেই পত্রিকারই আগামী বিশেষ সংখ্যার লেখক তালিকা প্রকাশ পায়। সেখানে জ্বলজ্বল করছে মনিদীপার সুলেখিকা বন্ধুটির নাম। মনিদীপার আত্মবিশ্বাসের দ্বিতীয়বার কার্ডিয়াক এরেস্ট হয়।
শাড়ির তাকটা গোছাতে গিয়ে আলমারী থেকে ধপ করে পড়ে গেল জিনিসটা। মনিদীপার ডায়েরি। তাই তো, বিয়ের পর অষ্টমঙ্গলায় গিয়ে এই ডায়েরিটাকে সঙ্গে করে এনেছিল। শাড়ি গোছানো থামিয়ে ডায়েরিটা হাতে নিয়ে বিছানার ওপর বসল মনিদীপা। ডায়েরীর মাঝখান থেকে একটা পাতা খুলল। কি আশ্চর্য! এই পাতাতে লেখা আছে অন্য এক প্রত্যাখ্যানের গল্প। প্রিয় বান্ধবীর দাদা, কলেজের সিনিয়র, অভিনব দে সেদিন ওর মনের কথা জানার পর ওকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। বাড়ি এসে কাঁদতে কাঁদতে অন্তরের বেদনাদায়ক অনুভূতিদের ডায়েরীর পাতায় বন্দী করেছিল। চোখের জল কাগজে পড়লে সে পাতায় ভাঁজ খাওয়া গোল দাগ হয়ে যায়। এখানে অনেকগুলো দাগ আজও রয়ে গেছে। মনিদীপা আরও একগোছা পাতা ওল্টায়। কোথায় গেল সেই পাতাটা? এই তো এখানে, ইউনিভার্সিটিতে সর্বজিতের সঙ্গে প্রথম দেখা হবার কথা লেখা আছে। তারপর পাতার পর পাতা জুড়ে রয়েছে বাসের টিকিট, সিনেমার টিকিট, রেস্টুরেন্টের বিল আরও অনেক সুমধুর স্মৃতিরা। কত ছিপছিপে ছিল তখন সর্বজিৎ জানা। আর এখন সে নাদুশ নুদুশ ভুঁড়ি নিয়ে রোজ রাতে ওর পাশে নাক ডাকিয়ে ঘুমায়। ডায়েরীটা বন্ধ করে মনিদীপা। মুখে স্মিত হাসি। আজ আবার কলম ধরতে মন চাইছে ওর। অন্যের ওঠা পড়ার গল্প নয়, আজ নিজের ওঠা পড়ার গল্প লিখবে। প্রতি গল্পের শেষে যেমন ইতিবাচক বার্তা দিয়ে সমাপ্তি লেখে আজও লিখবে। লিখতে ওকে হবেই। লেখা ছেড়ে দিলে হবে না। কারণ, অন্তরের অনুভূতিরা স্বতন্ত্র, তারা কারোর মনোনীত হবার জন্য ব্যক্ত হয় না। প্রত্যাখান কখনো পৃথিবীর শেষ কথা হতে পরে না। মনিদীপা ওর আদরের স্মার্টফোন হাতে তুলে নেয়। নতুন ওয়ার্ড ফাইল খুলে গল্প লিখতে শুরু করে। গল্পের শিরোনাম, ‘অমনোনীত’।
©পল্লবী পাল

